‘দেশনেত্রী’ ও ‘আপসহীন’ নেত্রী খালেদা জিয়ার চিরবিদায়
- আপডেট সময় : ১১:১৬:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ৭৭ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, উত্থান-পতন আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বিদায় নিলেন। সমর্থক-সমালোচক নির্বিশেষে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে সেই অধ্যায়ের ইতি টানল ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী রাজনীতির প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া। ‘দেশনেত্রী’ ও ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক ৮০ বছর বয়সে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে জানান, ‘আম্মা আর নেই।’ এর কিছুক্ষণ পরই সংবাদমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। মৃত্যুকালে তাঁর পাশে পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

জন্ম ও পারিবারিক জীবন
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা মেজর (অব.) ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এবং মাতা তৈমুরন নেসা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেন দুই পুত্র-তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনে যেমন গভীর শোক নেমে আসে, তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

রাজনীতিতে আগমন
স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে তিনি দ্রুত বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে তাঁর আপসহীন ভূমিকার কারণে তিনি জনগণের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর নেতৃত্বেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়—যা তাঁর অন্যতম ঐতিহাসিক অবদান হিসেবে বিবেচিত। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন। বিশেষ করে ২০০১–২০০৬ মেয়াদে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শিক্ষা খাতে বেশ কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেয়।

স্মরণীয় কাজ ও রাজনৈতিক অবস্থান
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষমতার বাইরে থাকলেও রাজপথে সক্রিয় থাকা। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে তাঁর ভূমিকা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
আপোষহীন নেত্রী হিসাবে পরিচিতি
খালেদা জিয়া সেই ১৯৮২ সালে যখন বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন চলছিল।
সেই শাসনের বিরুদ্ধে নয় বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতিতে নিজের এবং দলের অবস্থান তৈরি করেন বলে বিএনপি নেতারা মনে করেন।
বিএনপির নেতৃত্ব নেয়ার পরের বছর ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন।

অন্যদিকে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর পাঁচ দলীয় জোট। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের জোট এরশাদ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
তবে বিএনপির জোট নির্বাচনে অংশ না নিয়ে নয় বছর রাজপথের আন্দোলনে থাকায় খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রী হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনবার।
বিএনপি নিয়ে গবেষণাধর্মী বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বিএনপিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সব দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। নির্বাচনে খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবক’টি আসনেই নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সেই নির্বাচনের আগে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে থাকা তিন জোটের রূপরেখায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ছিল।
সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের পর গঠিত পঞ্চম সংসদে সংসদ নেতা হিসাবে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পাল্টিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তনের জন্য বিল উত্থাপন করেছিলেন এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা পাস হয়।
তখন দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফিরে আসে সংসদীয় সরকার। অলি আহমেদ বলেছেন, মিসেস জিয়ার এই অবদান মানুষের মাঝে বিএনপির অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

অসুস্থতা ও শেষ সময়
খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার, হৃদ্রোগ, কিডনি ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়া হলেও দেশে ফেরার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি আর চিকিৎসায় সাড়া দিতে পারেননি।
শেষ বিদায়
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, তাঁর জানাজা বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, উত্থান-পতন আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বিদায় নিলেন। সমর্থক-সমালোচক নির্বিশেষে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে সেই অধ্যায়ের ইতি টানল ইতিহাস।



















