ঢাকা ০৬:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাঘ-হাতি শিকারে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা নির্বাচনী মাঠে এখনো সমান সুযোগ, সম্প্রীতির বাংলাদেশই লক্ষ্য: প্রেস সচিব ইসলামী ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে টেকসই উন্নয়ন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সূচনা মাদুরোর নজির টেনে কাদিরভের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আহ্বান জেলেনস্কির এবার পাতানো নির্বাচন হবে না: কড়া বার্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনের মোদিকে শায়েস্তা করতে ট্রাম্পের কড়া পদক্ষেপ? ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি ৭ লাখ ২৮ হাজার প্রবাসীদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে ইসি এলপিজি ঘিরে নীরব অর্থনৈতিক সন্ত্রাসে জিম্মি ভোক্তা, কঠোর পদক্ষেপের দাবি ইসমত শিল্পীর কবিতা ‘অশ্রুবাষ্প’ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতিতে বাংলাদেশ: সর্বোচ্চ গুণতে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০১:০৩:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে

শীতের সব্জিতে ঠাঁসা বাজার :ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
কৃষক-ভোক্তা-দুজনই একই সুতোয় বাঁধা বঞ্চনার শিকার। এই চক্র ভাঙা না গেলে, খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত মানুষের ঘাম যেমন মূল্য পাবে না, তেমনি সাধারণ মানুষের থালাও থাকবে অনিশ্চয়তায়
ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁরা মাটির কাছে নত হয়ে জমিনে সোনা ফলান, সেই কৃষকরাই ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন সবচেয়ে বেশি

ঢাকার কাঁচাবাজারে ঢুকলেই চোখ কপালে ওঠার মতো দাম। প্রতি কেজি টমেটো ১০০ টাকা, শিম ৮০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, পটোল ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, গাজর ৬০ টাকা আর পেঁপে ৪০ টাকা। ফুলকপি ২৫–৩০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা পিস। শীতকালীন সবজিতে বাজার ঠাসা থাকলেও দামের চড়া গতি থামছে না।

ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম ছুটির দিন শুক্রবারেই ঢাকার বাজারে যেন আগুন লেগেছে। একই সঙ্গে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে মুরগির দামও। অথচ এই বাড়তি দামের কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা নেই, এমনটাই বলছেন ক্রেতা ও কৃষক উভয়েই।

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা
দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা

ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের কথা বললেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটে-ঘাটে শীতকালীন সবজি পর্যাপ্ত। বগুড়ার গ্রামীণ বাজারে যে ফুলকপি ৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ঢাকায় এসে সেটির দাম দাঁড়াচ্ছে ৩০ টাকা। কয়েক ধাপ পার হতে হতে সেই সবজি কোথায় যেন সেঞ্চুরি ছুঁয়ে ফেলে। আর তার নেপথ্যে কাজ করে আড়ৎকেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের প্রতিটি ধাপে রয়েছে অদৃশ্য কর, চাঁদাবাজি ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথে কৃষক কোথাও শক্ত অবস্থানে নেই। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁরা মাটির কাছে নত হয়ে জমিনে সোনা ফলান, সেই কৃষকরাই ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন সবচেয়ে বেশি। লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার ও প্রভাবশালী মহলের পকেটে।

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা
সব্জির বাজার চড়া : ছবি সংগ্রহ

ভোক্তাদের পুষ্টি যেখানে মৌলিক অধিকার, সেখানে সেই পুষ্টিই আজ সিন্ডিকেটের থাবায় বন্দী। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থায় এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর লাগামহীন তোলাবাজির দায় শেষ পর্যন্ত চাপছে ভোক্তার ঘাড়ে।

কাঁচা মরিচের বাজারও একই চিত্র। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। পাইকারিতে দাম ৭০-৮০ টাকা। অথচ উৎপাদন এলাকায় দাম অনেক কম।

পেঁয়াজ ও আলুর বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও স্বস্তির সুযোগ নেই। পুরোনো দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকায়, নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৬০ টাকা, আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজও ৬০ টাকার আশপাশে। নতুন আলুর দাম কেজিতে ২০ টাকা হলেও সেই সুবিধা পুরোপুরি পাচ্ছেন না ভোক্তারা।

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা
দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা

মুরগির বাজারেও একই গল্প। এক সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২০ টাকা, এখন কেজি ১৭০ টাকা। সোনালি মুরগি ৩০-৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৭০ টাকায়। লাল লেয়ার মুরগির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ টাকায়।

ক্রেতারা এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ। ঢাকার একটি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মোস্তাফিজুল ইসলাম বলেন, ভরা মৌসুমে শীতকালীন সবজির দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এটা সরাসরি কারসাজি। প্রশাসন চোখ বন্ধ করে বসে আছে।

প্রশ্ন উঠছে, এই বাজার কার নিয়ন্ত্রণে? কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পান, ভোক্তা যদি সাশ্রয়ী দামে খাবার না পান, তাহলে লাভবান হচ্ছে কারা? সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি আর কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই মূল্যসন্ত্রাস থামবে না।

কৃষক ও ভোক্তা-দুজনই আজ একই সুতোয় বাঁধা বঞ্চনার শিকার। এই চক্র ভাঙা না গেলে, খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত মানুষের ঘাম যেমন মূল্য পাবে না, তেমনি সাধারণ মানুষের থালাও থাকবে অনিশ্চয়তায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা

আপডেট সময় : ০১:০৩:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
কৃষক-ভোক্তা-দুজনই একই সুতোয় বাঁধা বঞ্চনার শিকার। এই চক্র ভাঙা না গেলে, খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত মানুষের ঘাম যেমন মূল্য পাবে না, তেমনি সাধারণ মানুষের থালাও থাকবে অনিশ্চয়তায়
ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁরা মাটির কাছে নত হয়ে জমিনে সোনা ফলান, সেই কৃষকরাই ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন সবচেয়ে বেশি

ঢাকার কাঁচাবাজারে ঢুকলেই চোখ কপালে ওঠার মতো দাম। প্রতি কেজি টমেটো ১০০ টাকা, শিম ৮০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, পটোল ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, গাজর ৬০ টাকা আর পেঁপে ৪০ টাকা। ফুলকপি ২৫–৩০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা পিস। শীতকালীন সবজিতে বাজার ঠাসা থাকলেও দামের চড়া গতি থামছে না।

ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম ছুটির দিন শুক্রবারেই ঢাকার বাজারে যেন আগুন লেগেছে। একই সঙ্গে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে মুরগির দামও। অথচ এই বাড়তি দামের কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা নেই, এমনটাই বলছেন ক্রেতা ও কৃষক উভয়েই।

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা
দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা

ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের কথা বললেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটে-ঘাটে শীতকালীন সবজি পর্যাপ্ত। বগুড়ার গ্রামীণ বাজারে যে ফুলকপি ৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ঢাকায় এসে সেটির দাম দাঁড়াচ্ছে ৩০ টাকা। কয়েক ধাপ পার হতে হতে সেই সবজি কোথায় যেন সেঞ্চুরি ছুঁয়ে ফেলে। আর তার নেপথ্যে কাজ করে আড়ৎকেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারের প্রতিটি ধাপে রয়েছে অদৃশ্য কর, চাঁদাবাজি ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথে কৃষক কোথাও শক্ত অবস্থানে নেই। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাঁরা মাটির কাছে নত হয়ে জমিনে সোনা ফলান, সেই কৃষকরাই ফসলের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন সবচেয়ে বেশি। লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার ও প্রভাবশালী মহলের পকেটে।

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা
সব্জির বাজার চড়া : ছবি সংগ্রহ

ভোক্তাদের পুষ্টি যেখানে মৌলিক অধিকার, সেখানে সেই পুষ্টিই আজ সিন্ডিকেটের থাবায় বন্দী। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থায় এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর লাগামহীন তোলাবাজির দায় শেষ পর্যন্ত চাপছে ভোক্তার ঘাড়ে।

কাঁচা মরিচের বাজারও একই চিত্র। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। পাইকারিতে দাম ৭০-৮০ টাকা। অথচ উৎপাদন এলাকায় দাম অনেক কম।

পেঁয়াজ ও আলুর বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও স্বস্তির সুযোগ নেই। পুরোনো দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকায়, নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৬০ টাকা, আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজও ৬০ টাকার আশপাশে। নতুন আলুর দাম কেজিতে ২০ টাকা হলেও সেই সুবিধা পুরোপুরি পাচ্ছেন না ভোক্তারা।

দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা
দাম বাড়ে বাজারে, ন্যায্য দাম পায় না মাঠে, বঞ্চনার চক্রে কৃষক-ভোক্তা

মুরগির বাজারেও একই গল্প। এক সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২০ টাকা, এখন কেজি ১৭০ টাকা। সোনালি মুরগি ৩০-৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২৭০ টাকায়। লাল লেয়ার মুরগির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ টাকায়।

ক্রেতারা এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ। ঢাকার একটি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মোস্তাফিজুল ইসলাম বলেন, ভরা মৌসুমে শীতকালীন সবজির দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এটা সরাসরি কারসাজি। প্রশাসন চোখ বন্ধ করে বসে আছে।

প্রশ্ন উঠছে, এই বাজার কার নিয়ন্ত্রণে? কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পান, ভোক্তা যদি সাশ্রয়ী দামে খাবার না পান, তাহলে লাভবান হচ্ছে কারা? সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি আর কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই মূল্যসন্ত্রাস থামবে না।

কৃষক ও ভোক্তা-দুজনই আজ একই সুতোয় বাঁধা বঞ্চনার শিকার। এই চক্র ভাঙা না গেলে, খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত মানুষের ঘাম যেমন মূল্য পাবে না, তেমনি সাধারণ মানুষের থালাও থাকবে অনিশ্চয়তায়।