দাম কাগজে, গ্যাস সিন্ডিকেটের হাতে: এলপিজিতে নাভিশ্বাস ভোক্তার
- আপডেট সময় : ১২:০৫:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬ ৫৪ বার পড়া হয়েছে
সিন্ডিকেট ভাইরাসে আক্রান্ত সিলিন্ডার গ্যাস
নির্ধারিত দামে নেই এলপিজি, বাড়তি খরচে দিশেহারা ভোক্তা
১২ কেজির সিলিন্ডর গ্যাসে ৬০০ টাকা বেশি গুণতে হয়
বেশি টাকার মিলছে সিলিন্ডার
দাম ঘোষণা করেই খালাস সরকার
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে বাংলাদেশ যেন এক অদৃশ্য কিন্তু ভয়ংকর ভাইরাসে আক্রান্ত তার নাম সিন্ডিকেট। নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, জনশক্তি সবখানেই এই ভাইরাসের বিস্তার। সর্বশেষ সংযোজন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। কাগজে-কলমে সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তব বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বরং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, কোথাও কোথাও আরও বেশি দামে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ডিসেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে ১ হাজার ২৫৩ টাকা। কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই দামে গ্যাস পাওয়া প্রায় অসম্ভব। দাম ঘোষণার পরপরই বাজারে তৈরি হয় কৃত্রিম সংকট। শুরু হয় বাড়তি দামে বিক্রি। অভিযোগ উঠেছে, সরকার শুধু দাম ঘোষণা করেই দায়িত্ব শেষ করছে, কার্যকর কোনো মনিটরিং বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই।
ভোক্তাদের অভিযোগ, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। যাত্রাবাড়ীর কাজলার বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া বলেন, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ২৫৩ টাকার সিলিন্ডার কিনতে তাকে গুনতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ এক সিলিন্ডারেই অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার টাকা। সেগুনবাগিচার বাসিন্দা জসিমউদ্দিন জানায়, ৩৬ কেজির সিলিন্ডার তাকে কিনতে হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ টাকায়। গৃহস্থালির রান্নায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়ায় অনেক পরিবার বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ এই সংকটের দায় কেউ নিতে চায় না।

ঢাকার একাধিক খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, তারা চাহিদা অনুযায়ী কোম্পানির কাছে অর্ডার দিলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। ফলে ক্রেতারা চাইলেও নির্ধারিত দামে দিতে পারছেন না। পরিবেশকদের ভাষ্য, বাড়তি দামে কিনতে হওয়ায় তারাও বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান। তিনি জানান, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ সীমিত বা বন্ধ রেখেছে। ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০টি। ট্রাক নিয়ে গিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে, পরিবহন ও শ্রম খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো নিজেরাই প্রতি সিলিন্ডারে ৭০ থেকে ৮০ টাকা বাড়তি নিচ্ছে। তবে তার মতে, ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই, খুচরা বিক্রেতাদের এমন আচরণ ঠিক নয়।
এদিকে আজ রোববার নতুন দাম ঘোষণার কথা রয়েছে বিইআরসির। সংস্থাটি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, শীতকালে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ায় দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি জাহাজ সংকট। নিয়মিত পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি কমে নেমে এসেছে প্রায় ৯০ হাজার টনে, যেখানে স্বাভাবিক আমদানি থাকে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। লোয়াবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ বলেন, ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। জাহাজ না পাওয়ায় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে তারা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজি দিচ্ছেন। খুচরা পর্যায়ের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে বিইআরসি। কিন্তু শুরু থেকেই বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তবে এবারের পরিস্থিতি নজিরবিহীন। বিষয়টি বিইআরসির নজরে আসার পর লোয়াবকে চিঠি দিয়ে নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, মজুত, বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউশন ও খুচরা—কোনো পর্যায়েই বাড়তি দাম নেওয়া যাবে না। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরবরাহ না থাকলেও বেশি দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে—এটাই প্রমাণ করে বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয়। অথচ আইন অনুযায়ী বাড়তি দামে বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিইআরসি কিংবা স্থানীয় প্রশাসন সেই শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না। এতে ভোক্তার আস্থা নষ্ট হচ্ছে। সরবরাহ সংকটের নামে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও দায়হীন মনিটরিং ব্যবস্থাই প্রমাণ করে—এলপিজি বাজার এখনো সিন্ডিকেটমুক্ত হয়নি। এর চূড়ান্ত মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা, যাদের মাসের শেষে হিসাব মেলানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।



















