ঝিলম ত্রিবেদীর কবিতা অপেক্ষা
- আপডেট সময় : ০৭:১৭:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৮ বার পড়া হয়েছে
উপেক্ষা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ
দুপুরবেলা
চারপাশে ক্লান্তি, আক্ষেপ
তোমার চোখের মণি ভরে ভাসে খিদের কাজল
দাঁড়িয়ে আছ
কে নেবে ওই বিমর্ষ পসরা তোমার
চোখে আঘাতের ভার
নিরপরাধের রোদ গায়ে
দাঁড়িয়ে আছ
আমিও তো দীপ্তিহীনতায় এ-স্টেশন এই চরাচরে
বসে থাকি
বসে থাকি, বিড়ি খাই, সুদীপ্ত মানুষ এসে বসে
দূরে বসে, বিড়ি খায়, ধোঁয়া ওড়ে অনিশ্চয়তায়
মাসি ভাত বাড়ে স্বামীর অন্তরের থালায়
দুটি প্রাণী ভাত খায় জারুলপাতার মতো দোঁহে
অন্ন মুখে তোলে
আমার হৃদয় ভরে জল আসে
পান করি আমি
দুটি প্রাণীর নিতল স্নেহতলি
তুমি দূরে কী অবান্তর তাকিয়েই থাকো নিরবধি
কেউ যদি
সংসারের দুটি বাদামের পাতা কিনে নেয়
আমিও তোমার মতো মর্যাদাহীন দ্বিপ্রহর
আচারের কাগজ চাটি, চেটে চেটে শূন্য করেছি
আমার বুভুক্ষু ক্রোধ
আমার ডাগর অপমান
শিশু হাসে
আজও দেখো শিশুরাই পূর্ণতর প্রাণ
শ্রাবণের ঘুগনি আর ভাদ্রের মুড়ি খাবে এসো
এসো এই স্টেশনেই আমরা দুজন বসি পাশে
দিদা দিক দাদু দিক জীবনের নিবিড় অধিকার
তারপর
ফিরে যাব, তারপর আবার তুমি একা
সৃষ্টির পথে পথে শশার পসরা সাজিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকবে
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে রোদ হয়ে

( ঝিলম ত্রিবেদী (Jhelum Trivedi) সমসাময়িক বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণকারী এই কবি দর্শনে শিক্ষিত, যা তাঁর কবিতার বৌদ্ধিক গভীরতা ও দার্শনিক অনুসন্ধানকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে লেখালেখি শুরু করেন প্রায় ২৭ বছর বয়সে; তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কবিতা পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
ঝিলম ত্রিবেদীর কবিতার মূল শক্তি নিহিত রয়েছে গভীর আবেগ, তীক্ষ্ণ সমাজচেতনা এবং মানবিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকে শিল্পিত ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতায়। তাঁর কবিতায় সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ, নারী–পুরুষের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব ও সংবেদনশীলতা, নারীর যন্ত্রণা ও অন্তর্নিহিত শক্তি, পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম গভীর রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। এসব কবিতা কেবল অনুভূতিকে স্পর্শ করে না, পাঠককে ভাবনার গভীরে টেনে নিয়ে যায়।
২০১৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিরুদ্দেশ তাঁকে সমসাময়িক বাংলা কবিতায় সুস্পষ্টভাবে পরিচিত করে তোলে। এই গ্রন্থে ব্যক্তিগত বেদনা ও সামাজিক বাস্তবতা একত্রে মিশে এক দহনময় কাব্যভাষা নির্মাণ করেছে। পাশাপাশি ‘গুমটির আগুন’, ‘মুগ্ধ জবা’, ‘চিঠি’, ‘সারদা’ ও ‘মেয়েটি’-র মতো কবিতায় তিনি সমকালীন সমাজের অন্ধকার দিক, মানবিক সম্পর্কের ভাঙন ও প্রত্যাশার সূক্ষ্ম স্তরগুলো গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। ঝিলম ত্রিবেদীর কবিতা বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা ও প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলালাইভ, সাইন্যাপস পত্রিকা, কালিমাটি অনলাইন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক তাঁর কবিতা পাঠের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। এই বহুমাত্রিক প্রকাশনার ফলে তাঁর কবিতা বিস্তৃত পাঠকসমাজে পৌঁছেছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সাহসী ও দহনময় কলমের মাধ্যমে ঝিলম ত্রিবেদী সমসাময়িক বাংলা কবিতায় একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতা প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠলেও তা কখনোই মানবিক সংবেদন ও নান্দনিকতার বাইরে যায় না, বরং এই দুইয়ের সম্মিলনেই তাঁর কবিতার প্রকৃত শক্তি নিহিত।)



















