জুলাই বিপ্লবের এক বছরে মানুষের আশা হতাশায় পরিণত
- আপডেট সময় : ১১:৩৭:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫ ৩৪৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের কাঠামোগত সংস্কারের ধীরগতিতে অনেক বাংলাদেশি এখন হতাশ হয়ে পড়েছেন। এক বছর পরে এসে তারা ভাবছেন, আবু সাঈদের মতো প্রতিবাদকারীদের জীবন কি তবে বৃথা গেল? নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিপ্লবের এক বছর পর বাংলাদেশে সংস্কারের ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ, অর্থনৈতিক সংকট এবং আগের সমস্যাগুলো এখনও অব্যাহত থাকা নিয়ে বিশদ আলোচনা।
চব্বিশে বাংলাদেশে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন। সে সময় রংপুর শহরে সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে সাহসী ভঙ্গিতে দাঁড়ান আবু সাঈদ। মুহূর্তেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে আহত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। গণঅভ্যুত্থানে নিহত প্রায় ১৪শ জনের মধ্যে আবু সাঈদ একজন।
এই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং তিনি ভারতে পালিয়ে যান। তিনি এমন একটি দেশ ছেড়ে যান, যা অরাজকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। তবে তাঁর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আশার আলোও ফুটে উঠেছিল।
শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশকে আরও ন্যায়সংগত এবং কম দুর্নীতিগ্রস্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন। তারা নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগে সহায়তা করেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও গেড়ে বসা আমলাতন্ত্রের মতো পদ্ধতিগত সমস্যাগুলো দূর করতে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও এ সমস্যাগুলোও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে উস্কে দিয়েছিল।
শিক্ষার্থীরা চাইছেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়িত হোক। তারা চাইছেন, গত বছরের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় যেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত, তাদের দ্রুত শাস্তি কার্যকর হোক।
আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, এটি আমাকে কষ্ট দেয়। আমরা ভেবেছিলাম দেশ নৈতিকভাবে উন্নত হবে, বৈষম্য দূর হবে, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, হত্যাকারীরা শাস্তি পাবে এবং সেই শাস্তি অপরাধীদের ভয় দেখাবে। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। তবে রমজানের মতে, ড. ইউনূস না থাকলে পরিস্থিতি সম্ভবত আরও খারাপ হতো।
নতুন যুগের সূচনা
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের সংস্কার করার বিশাল ভার এখন ড. ইউনূসের কাঁধে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে এখনও বিভাজন রয়েছে এবং এখানে প্রায় ৬০টি রাজনৈতিক দল সক্রিয়।
ড. ইউনূসের প্রথম কাজ ছিল আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য ছিল, একটি বিস্তৃত সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। শেখ হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে যেসব প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এনেছিলেন, সেগুলোর সংস্কার করা ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু এই সংস্কারের কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। এর আশাও এখন হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থায়।
আন্দোলনের সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ সালেহীন অয়ন। তিনি বলেন, এখন সবকিছুই এলোমেলো মনে হচ্ছে। আমাদের স্বপ্নও অপূর্ণ রয়ে গেছে। ছাত্রনেতারা যে উদ্যমে তাদের পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন, তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে ড. ইউনূস ঘোষণা করেছেন, সংস্কার করা ভোটদান ব্যবস্থার অধীনে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এখনও অনেক বিষয়ের সমাধান বাকি রয়ে গেছে।
শেখ হাসিনার পতনের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেছেন, তাঁর সরকার সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত একটি দেশ পেয়েছিল। তবে এটি ধীরে ধীরে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। তাঁর সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূসের অর্ধেকের বেশি সময় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ সংক্রান্ত আলোচনায় কেটে গেছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ পতনের পর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিএনপি। দলটি জোর দিয়ে বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যান্য সংস্কারের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
তবে দেশের বৃহত্তম ইসলামিক দল জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিস্তৃত পরিসরে সংস্কারের পর নির্বাচন চাইছে। সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাব তদারক করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল দুই মাস ধরে সাংবিধানিক ও শাসন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, এই আলোচনায় কোনো তিক্ত বাক্য বিনিময় হয়নি, যা অগ্রগতির আশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বিভিন্ন দল স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোয় একমত হয়েছে।



















