জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েই ধানের শীষে ভোট চাইলেন আওয়ামী লীগের নেতারা
- আপডেট সময় : ০৬:২০:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের নির্বাচনী প্রচারণায় অপ্রত্যাশিত ও তাৎপর্যপূর্ণ এক ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হয়ে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ জন আলোচিত নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, তাঁরা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েই ভোট চেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীর জন্য। ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে আয়োজিত উঠান বৈঠকে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের বাঁ পাশে বসেন শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান এবং ডান পাশে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন খান।
একই মঞ্চে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি বসে বক্তব্য দেওয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরল ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের এসব নেতার দাবি, সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশেই তাঁরা ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন। তাঁদের এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে শিবচরের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মীরা বলছেন, মাদারীপুর-১ আসন ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা। জেলার বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশই সাবেক সংসদ সদস্য নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের অনুসারী।
তাঁর ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে উঠান বৈঠকে অংশ নিয়ে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। এর ফলে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার তাঁর দুই ‘বিদ্রোহী’ প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ভোটের মাঠে এগিয়ে গেছেন বলে মনে করছেন দলটির স্থানীয় নেতারা।
বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার থেকে নাদিরা আক্তার নিয়মিতভাবে আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে উঠান বৈঠক করে আসছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যার বৈঠকটি ছিল সবচেয়ে বড় পরিসরের। এতে সরাসরি মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন উভয় দলের নেতারা।
পৌর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হেমায়েত হোসেন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উঠান বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন খান, যুগ্ম আহ্বায়ক জহের গোমস্তা, সদস্য আবু জাফর চৌধুরী, পৌর বিএনপির সদস্যসচিব আজমল খানসহ বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোহল রানা।
সভায় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে বক্তব্য দেন। উপস্থিত ছিলেন শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান, কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএম আতাহার ব্যাপারী, শিবচর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ইলিয়াস পাশা, চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন রায়হান সরকার, কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহসিন উদ্দিন, বহেরাতলা উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন হায়দার, মাদবরেরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফজলু মুন্সি, বাঁশকান্দী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান খোকন বায়াতি, কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হাজী আতিকুর মাদবরসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা।
উঠান বৈঠকে শিবচর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার হোসেন খান টানা তিন মিনিট ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বক্তব্য দেন এবং ধানের শীষের পক্ষে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বক্তব্যের শেষেও তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে স্লোগান দেন, যা উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নিজের বক্তব্যে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার বলেন, “আমাদের আগামীর রাষ্ট্রনায়ক, দলের চেয়ারম্যান বলেছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। তাই আমরা বলছি, সবার আগে শিবচর। কে কোন দল করল, সেটি বড় বিষয় নয়; বড় বিষয় হলো আমরা সবাই মানুষ এবং ঐক্যবদ্ধ।” তিনি আরও আশ্বাস দেন, নির্বাচনের পর শিবচরে কারও নামে মিথ্যা মামলা বা অযথা হয়রানি করা হবে না। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে শিবচরকে আধুনিক ও উন্নত হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন খান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন জানাতে এসেছেন। এখানে কোনো দলকে পুনর্বাসনের প্রশ্ন নেই।
উল্লেখ্য, শুরুতে বিএনপি মাদারীপুর-১ আসনে কামাল জামান মোল্লাকে মনোনয়ন দিয়েছিল। পরে মনোনয়ন পরিবর্তন করে নাদিরা আক্তারকে প্রার্থী করা হয়। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিলে সম্প্রতি এই আসনের দুই বিদ্রোহী প্রার্থীসহ উপজেলা বিএনপির ১০ নেতাকে সব পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় কমিটি।
এদিকে বহিষ্কৃত দুই বিদ্রোহী প্রার্থীও আওয়ামী লীগের নেতাদের সমর্থন নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি জাহাজ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী কামাল জামান মোল্লার উঠান বৈঠকে শিবচর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা এবং পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি তোতা খানকে অতীতের ভুল স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশ করতে দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে মাদারীপুর-১ আসনের নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের এই পারস্পরিক সমর্থন ও অবস্থান পরিবর্তন স্থানীয় রাজনীতিকে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।



















