গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন: গুমের পর হত্যা করে লাশ ফেলা হতো বলেশ্বর ও পাথরঘাটায়
- আপডেট সময় : ০৯:৩৭:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬ ৩৭ বার পড়া হয়েছে
সোমবার গুলশানে তদন্ত কমিশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্যরা : ছবি সংগ্রহ
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে গুম করে হত্যার পর বহু ব্যক্তির লাশ বরিশালের বলেশ্বর নদে ও বরগুনার পাথরঘাটায় ফেলে দেওয়া হতো। এ ছাড়া মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থানের সন্ধান মিলেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিশন। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার রাজধানীর গুলশানে কমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। এর আগে রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে একাধিকবার দেওয়া ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে গুমের সংজ্ঞার বাইরে বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সক্রিয়ভাবে তদন্তাধীন ছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩৬ জনের ক্ষেত্রে গুমের পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, তুলে নেওয়ার স্থান, আয়নাঘর এবং ডাম্পিং প্লেস পরিদর্শন করেছে। মুন্সিগঞ্জে পাওয়া বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থানে দাফন করা মরদেহগুলোর মাথায় গুলির চিহ্ন এবং দুই হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় থাকার তথ্য সুরতহাল প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে, যা গুম–পরবর্তী হত্যার স্পষ্ট আলামত বলে উল্লেখ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বরিশালের বলেশ্বর নদ ও বরগুনার পাথরঘাটাকে ডাম্পিং প্লেস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বরিশালে দুটি মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তদন্তের সূচনা করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ শনাক্তে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি বিস্তৃত ডিএনএ তথ্যভান্ডার গঠনের সুপারিশ করেছে কমিশন।

গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে কমিশন ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তি, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিলের সুপারিশ রয়েছে। পাশাপাশি সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ এবং ‘আয়নাঘরগুলোকে’ স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন জানান, সারা দেশে অন্তত ৪০টি গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টি র্যাবের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কমিশনের কাজ শুরুর পর গুমের আলামত ধ্বংসে র্যাবই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গুমের অভিযোগের প্রায় ২৫ শতাংশে র্যাব এবং ২৩ শতাংশে পুলিশ জড়িত। এ ছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বহু ক্ষেত্রে সাদাপোশাকধারীরা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ চালিয়েছে। কমিশনের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চার ইঙ্গিত বহন করে।
গুমসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে পুশ ইন হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য যাচাইয়ে একটি ঘটনায় গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহর সন্ধান মিলেছে। বাকি ক্ষেত্রে গুমের শিকার ব্যক্তিদের কোনো নাম পাওয়া যায়নি বলে কমিশন জানিয়েছে।


















