গভীর সমুদ্রে লুকানো সম্ভাবনা: গবেষণা ও নীতিগত প্রস্তুতির তাগিদ প্রধান উপদেষ্টার
- আপডেট সময় : ০৫:৩০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬ ৫৪ বার পড়া হয়েছে
গভীর সমুদ্রে গবেষণা জোরদার ও বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen–এর মাধ্যমে পরিচালিত সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম বিষয়ক জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয় সংশ্লিষ্ট কমিটি। এ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
জানা গেছে, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ জরিপ পরিচালিত হয়। আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের গবেষক।
সভায় অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। তিনি জানান, এ গবেষণায় নতুন ৬৫টি জলজ প্রাণীর প্রজাতির অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে গভীর উদ্বেগজনক চিত্র। তাঁর ভাষায়, গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত। এর পেছনে ওভারফিশিংকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রায় দুই হাজার মিটার গভীরতায়ও প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা গভীর সমুদ্র দূষণের ভয়াবহতার প্রমাণ। ২০১৮ সালের গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং স্বল্প গভীরতায় মাছের মজুত আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ফিশিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ট্রলার সোনার প্রযুক্তির মাধ্যমে টার্গেটেড ফিশিং করছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় নিয়োজিতদের লাভ হলেও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরায় নিয়োজিত জেলেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “এই ধরনের টার্গেটেড ফিশিং চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনার ফিশিংয়ের বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।
গবেষণায় বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ও সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিশিং নার্সারি শনাক্ত করা হয়েছে, যা সংরক্ষণের জন্য ইতোমধ্যেই সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমাদের দেশের স্থলভাগের সমপরিমাণ জলভাগ রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, সম্ভাবনা ও ব্যবহারের পথ আমরা এখনো পুরোপুরি জানতে পারিনি। এ সম্পদ কাজে লাগাতে হলে গবেষণা ও পলিসি সাপোর্ট অত্যন্ত জরুরি।
সভায় আরও জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির বহুমুখী হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ ভেসেল সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে, যা দেশের সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বাড়াবে।
প্রধান উপদেষ্টা জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করতে হবে। যাদের এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে, তাদের সঙ্গে সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে এগোতে হবে। এভাবেই অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন সম্ভব হবে।”



















