গণতান্ত্রিক ভোটে তিন দশক পর দেশের নেতৃত্বে বিএনপি
- আপডেট সময় : ১২:৫৬:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
শুক্রবার বেলা ১২টা নাগাদ ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফল ঘোষণা হয়ে গেছে। ঘোষিত ফল অনুযায়ী, বিএনপি ও তাদের জোটের প্রার্থীরা জিতেছে ২১৩টি আসন, যা দেশের নতুন সরকার গঠনের পথে প্রমাণিত শক্তিশালী বিজয়। দলের পক্ষ থেকে জানা গেছে, আগামী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭৪টি আসন, আর অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৯টি আসনে।
ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের সরকার ক্ষমতায় ছিল। দীর্ঘ সময় বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
নির্বাচনে জয় উদযাপনের জন্য কোনো মিছিলের আয়োজন করা হবে না। দলের প্রেস উইং জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও উপাসনালয়ে শুকরিয়া আদায় ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১,৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন, এবং নারী প্রার্থী ৮৩ জন। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০, এবং হিজড়া ভোটার ১,২৩২ জন। দেশের ৪২,৭৭৯টি কেন্দ্র সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ভোটগ্রহণ শুরু করে বিকেল সাড়ে ৪টায় শেষ হয়, তারপরে গণনা কার্যক্রম শুরু হয়।
শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকায় এবার ২৯৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
বিএনপির বিজয়কে কেন্দ্র করে দেশের প্রতিটি প্রান্তে আনন্দ ও উৎসবের সুর বিরাজ করছে, আর নাগরিকরা আশা করছেন নতুন সরকারের নেতৃত্বে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
একই দিনে অনুষ্ঠিত সংস্কার প্রশ্নে গণভোটেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়েছে, যা জুলাই সনদভুক্ত সংবিধান সংস্কারের ৪৮ দফা বাস্তবায়নের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদিও গণভোটের প্রশ্ন ও প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা পেয়েছে ৪২টি আসন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বিজেপি ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক এনসিপি পেয়েছে তিনটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন চারটি আসনে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন
১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছিল খালেদা জিয়া-র নেতৃত্বে। এবার তারই উত্তরসূরি তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে দলটি চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফিরতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর টানা দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুটি নির্বাচন বর্জন ও একটিতে ভরাডুবির পর নতুন বাস্তবতায় ফিরে এল।
আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে প্রায় ৩৫ বছরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাইরে রেখেই ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। দীর্ঘ সময় দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা-কে কেন্দ্র করে, যা বিদেশি গণমাধ্যমে একসময় ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন; খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন তারেক রহমান। ২২ জানুয়ারি সিলেটের আলীয়া মাদ্রাসা থেকে প্রচার শুরু করে তিনি সারাদেশে জনসভা করেন। প্রচারে জামায়াতকে লক্ষ্য করে তীব্র সমালোচনা করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও ধর্মের নামে রাজনীতি’ না করার আহ্বান জানান। অন্যদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান শরিয়াহভিত্তিক ভাবধারাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে প্রচারে নামেন এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকার করেন।

যেমন হলো ভোট
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মোটাদাগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ হয়। ৩৬ হাজার ৩১টি কেন্দ্রে দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। মোট ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ৯ ঘণ্টা শেষে চূড়ান্ত হার এখনো জানানো হয়নি।
বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার খবর এলেও বড় ধরনের গোলযোগ হয়নি; কোনো কেন্দ্র বাতিল বা স্থগিত করতে হয়নি। ভোট চলাকালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, মানিকগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাইবান্ধায় ছয়জনের মৃত্যু হয়, যাদের পাঁচজন অসুস্থতায় এবং একজন ধাক্কার অভিযোগে মারা যান বলে জানা গেছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কয়েকটি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তোলে; এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও দুপুরের পর অনিয়মের অভিযোগ আনে। তবে নির্বাচন কমিশন জানায়, পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণে এবং ভোট হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইইয়াবস নাগরিক অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। রাতের দিকে কয়েকটি আসনে ফল ঘোষণা বিলম্ব নিয়ে জামায়াতের আমির অভিযোগ তুললেও বিস্তারিত জানাননি।

সংযমের আহ্বান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় জাতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব গণতন্ত্রের প্রতি দেশের অঙ্গীকারকে প্রমাণ করেছে। ফল ঘোষণার পরও রাজনৈতিক শালীনতা ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির এই প্রত্যাবর্তন শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; প্রায় তিন দশক ধরে চেনা নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা বলেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। এখন নজর থাকবে, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুত রাজনৈতিক পুনর্গঠন কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এগোয়।


















