খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা: দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে সম্ভাবনার নীরব বার্তা
- আপডেট সময় : ১১:৩৯:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাতে এসে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের স্পিকার আয়াজ সাদিক ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ছবি: সংগৃহীত
বুধবার শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানায়নি বাংলাদেশ, একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির উদ্দেশে পাঠিয়েছে একটি গভীর, সংযত ও তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা রূপ নেয় এক বিরল রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমাবেশে, যেখানে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক থাকা ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরাও একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্য দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় দেশ-বিদেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে।
জনসমুদ্র ও রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি
রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে জানাজাটি পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থ, আইন, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টারা। সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রধানসহ আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও কূটনৈতিক তাৎপর্য
বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরে থেকে আগত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি জানাজাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়। পাকিস্তান, ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মন্ত্রী ও সংসদীয় নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার ৩০টির বেশি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা এতে অংশ নেন। বিমসটেক ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার পর ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের একই অনুষ্ঠানে উপস্থিতি নীরব হলেও তাৎপর্যপূর্ণ একটি বার্তা-যা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে সংলাপ ও পুনঃসংযোগের সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত উপস্থিতি জানাজার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে। এটি কেবল দলীয় নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের এক প্রতীকী প্রকাশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই বিপুল জনসমাগম প্রমাণ করে, মানুষের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল। এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে।
দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে সম্ভাবনার জানালা
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুলের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম যাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে সম্ভাবনার একটি জানালাও খুলে দিয়েছে। সার্ক প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত উপস্থিতি আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশ চাইলে এখান থেকে দক্ষিণ এশীয় ঐক্য ও সংলাপের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে, যা এই বিদায়কে কেবল শোকের নয়, সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবেও ইতিহাসে স্থান দেবে।


















