ঢাকা ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চাউলের দাম বৃদ্ধির খবরে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রথানমন্ত্রীর নির্দেশ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ কেন অবৈধ নয় জানতে চেয়ে হাই কোর্টের রুল সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি নির্দেশনা দূতাবাসের ঈদযাত্রা ঘিরে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু, টার্মিনাল ও স্টেশনে ভিড় দুবাই ছাড়তে ধনকুবেরদের হুড়োহুড়ি, প্রাইভেট জেটের ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে গতি আনতে একমত ঢাকা-দিল্লি চাঁদাবাজি-ছিনতাই দমনে জিরো টলারেন্স: মাঠ পর্যায়ে কঠোর বার্তা আইজিপির কুয়েতে তিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত, কারণ জানাল যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের ‘নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু আর নেই

কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০২:৪৭:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ১০৫ বার পড়া হয়েছে

পায়ে পেটে প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র পারি দিতে যাওয়া মানুষের দল : ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

এক সময় যার নাম শুনলেই বুক কেঁপে উঠত, যার খরস্রোতা ঢেউয়ে তীরভাঙন আর নৌডুবির গল্প শোনা যেত, সেই প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র আজ নীরব, জলহীন ও ক্লান্ত। গাইবান্ধার বুকে বয়ে যাওয়া এই নদী এখন আর আগের মতো ভয়ংকর নয়, বরং করুণ। যেন জীবনের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধ বুকে তার শুধু ধু ধু বালুচর, ডুবোচর আর মানুষের পায়ের ছাপ। স্রোতের গর্জনের জায়গায় এখন শোনা যায় দীর্ঘশ্বাস, ঢেউয়ের বদলে চোখে পড়ে মরুভূমির মতো বিস্তীর্ণ বালুর প্রান্তর।

যেখানে এক সময় নৌকার পাল উঠত, মাঝির হাঁক আর পানির ছলাৎছল শব্দে মুখর থাকত নদীপথ, সেখানে আজ মানুষ পায়ে হেঁটে এপার-ওপার হচ্ছে। কোথাও কোথাও সামান্য বাঁশের সাঁকো, আবার কোথাও ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। আট থেকে দশ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পার হতে হচ্ছে নদীর বুক। এক সময় যে নদী জীবন বাঁচাত, আজ সেই নদীই মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ব্রহ্মপুত্র শুকনো থাকে। শুষ্ক মৌসুম এলেই নাব্য সংকটে নদীর বুকে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ চর ও বালুচর। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গাইবান্ধার কৃষিনির্ভর চরাঞ্চলে। ধান, ভুট্টা, পাট আর সবজির মাঠে পরিশ্রমের ঘাম ঝরালেও সেই ফসল বাজারে পৌঁছানোই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। নৌপথ বন্ধ থাকায় কৃষকদের বাড়তি খরচ, সময় ও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। অনেক সময় কষ্ট করে ফলানো ফসলের ন্যায্য দামও পান না তারা।

কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর
কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর, ছোট্ট সার্কে পারি দিচ্ছে চরের মানুষ: ছবি সংগ্রহ

এই জলহারা নদীর সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। চরাঞ্চলের আট হাজারের বেশি স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী প্রতিদিন খোলা বালুচর পাড়ি দিয়ে পড়াশোনায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। কুয়াশায় পথ হারানোর শঙ্কা, শীতে অসুস্থ হয়ে পড়া, বর্ষায় হঠাৎ পানি বাড়ার ভয়, সব মিলিয়ে তাদের যাত্রা অনিশ্চিত। ছোট ছোট পা নিয়ে বালুর ওপর হাঁটতে হাঁটতে তাদের শৈশব যেন সময়ের আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

চিকিৎসাসেবার অবস্থা আরও করুণ। চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল। অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী কিংবা শিশুকে চিকিৎসার জন্য মূল ভূখণ্ডে নিতে হলে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। শুকনো মৌসুমে বালুচরের কষ্ট, বর্ষায় উত্তাল পানির ঝুঁকি-দুই মৌসুমেই জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে হয় চরবাসীকে।

ব্রহ্মপুত্রের এই নীরব কান্না শুধু একটি নদীর গল্প নয়,  এটি চার লাখ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। নদী শুকিয়ে গেলে থেমে যায় যোগাযোগ, সংকুচিত হয় জীবিকা, পিছিয়ে পড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। তাই চরবাসীর মুখে আজ একটাই কথা ‘নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে’। প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের বুকে জমে থাকা বালুর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে সেই আকুতি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর

আপডেট সময় : ০২:৪৭:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

এক সময় যার নাম শুনলেই বুক কেঁপে উঠত, যার খরস্রোতা ঢেউয়ে তীরভাঙন আর নৌডুবির গল্প শোনা যেত, সেই প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র আজ নীরব, জলহীন ও ক্লান্ত। গাইবান্ধার বুকে বয়ে যাওয়া এই নদী এখন আর আগের মতো ভয়ংকর নয়, বরং করুণ। যেন জীবনের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধ বুকে তার শুধু ধু ধু বালুচর, ডুবোচর আর মানুষের পায়ের ছাপ। স্রোতের গর্জনের জায়গায় এখন শোনা যায় দীর্ঘশ্বাস, ঢেউয়ের বদলে চোখে পড়ে মরুভূমির মতো বিস্তীর্ণ বালুর প্রান্তর।

যেখানে এক সময় নৌকার পাল উঠত, মাঝির হাঁক আর পানির ছলাৎছল শব্দে মুখর থাকত নদীপথ, সেখানে আজ মানুষ পায়ে হেঁটে এপার-ওপার হচ্ছে। কোথাও কোথাও সামান্য বাঁশের সাঁকো, আবার কোথাও ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। আট থেকে দশ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পার হতে হচ্ছে নদীর বুক। এক সময় যে নদী জীবন বাঁচাত, আজ সেই নদীই মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ব্রহ্মপুত্র শুকনো থাকে। শুষ্ক মৌসুম এলেই নাব্য সংকটে নদীর বুকে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ চর ও বালুচর। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গাইবান্ধার কৃষিনির্ভর চরাঞ্চলে। ধান, ভুট্টা, পাট আর সবজির মাঠে পরিশ্রমের ঘাম ঝরালেও সেই ফসল বাজারে পৌঁছানোই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। নৌপথ বন্ধ থাকায় কৃষকদের বাড়তি খরচ, সময় ও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। অনেক সময় কষ্ট করে ফলানো ফসলের ন্যায্য দামও পান না তারা।

কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর
কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর, ছোট্ট সার্কে পারি দিচ্ছে চরের মানুষ: ছবি সংগ্রহ

এই জলহারা নদীর সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। চরাঞ্চলের আট হাজারের বেশি স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী প্রতিদিন খোলা বালুচর পাড়ি দিয়ে পড়াশোনায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। কুয়াশায় পথ হারানোর শঙ্কা, শীতে অসুস্থ হয়ে পড়া, বর্ষায় হঠাৎ পানি বাড়ার ভয়, সব মিলিয়ে তাদের যাত্রা অনিশ্চিত। ছোট ছোট পা নিয়ে বালুর ওপর হাঁটতে হাঁটতে তাদের শৈশব যেন সময়ের আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

চিকিৎসাসেবার অবস্থা আরও করুণ। চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল। অসুস্থ রোগী, গর্ভবতী নারী কিংবা শিশুকে চিকিৎসার জন্য মূল ভূখণ্ডে নিতে হলে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। শুকনো মৌসুমে বালুচরের কষ্ট, বর্ষায় উত্তাল পানির ঝুঁকি-দুই মৌসুমেই জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে হয় চরবাসীকে।

ব্রহ্মপুত্রের এই নীরব কান্না শুধু একটি নদীর গল্প নয়,  এটি চার লাখ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। নদী শুকিয়ে গেলে থেমে যায় যোগাযোগ, সংকুচিত হয় জীবিকা, পিছিয়ে পড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। তাই চরবাসীর মুখে আজ একটাই কথা ‘নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে’। প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের বুকে জমে থাকা বালুর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে সেই আকুতি।