এলপিজি অটোগ্যাস সংকট: গ্যাস আছে, তবু নেই, কৃত্রিম অরাজকতায় জনজীবন বিপর্যস্ত
- আপডেট সময় : ১২:৪৬:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬ ৬৩ বার পড়া হয়েছে
এলপিজি অটোগ্যাস সংকট সংকট নিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, সংকটের সভাপতি সিরাজুল মাওলা
দেশে এলপিজি অটোগ্যাসের কথিত ‘সংকট’ এখন আর জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, এটি পরিণত হয়েছে একটি সুসংগঠিত অরাজকতা ও লুণ্ঠনের চিত্রে। সংকটের অজুহাতে সারাদেশের প্রায় সব অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন কার্যত বন্ধ, বিপাকে পড়েছেন লাখো যানবাহন চালক, শ্রমজীবী মানুষ ও উদ্যোক্তারা।
অথচ সরকারিভাবে স্বীকার করা হচ্ছে, এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, আমদানিও বেড়েছে। তাহলে এই ভয়াবহ সংকট তৈরি হলো কীভাবে?
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এলপিজির মোট চাহিদা ১ লাখ ৪০ হাজার টন। এর মাত্র ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৫ হাজার টন ব্যবহৃত হয় অটোগ্যাসে।
এই সামান্য অংশ সরবরাহ না করতে পারা জ্বালানি খাতের চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সারাদেশে প্রায় ১ হাজার অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ থাকায় হাজার হাজার কর্মচারী বেতন পাচ্ছেন না, উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে দেউলিয়া হওয়ার পথে।
এদিকে ভোক্তারা পড়েছেন আরও ভয়াবহ ফাঁদে। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে তা বিক্রি হচ্ছে ১৯০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এই দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এটি নিছক বাজারের চাহিদা-যোগানের সমস্যা নয়; এটি প্রকাশ্য কালোবাজারি, মজুদদারি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সাঈদা আক্তার বলেন, দিনভর সংসারের অদৃশ্য শ্রম শেষে গভীর রাতে বিশ্রামে যান একজন গৃহিণী। কিন্তু ভোর হতেই শুরু হয় নতুন দুশ্চিন্তা-অফিসগামী পরিবারের সদস্য, সন্তানের স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি আর রান্নাঘরের অনিশ্চয়তা। শীতকালে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এই দুশ্চিন্তা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
তিনি বলেন, যারা এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য প্রতিদিনের জীবন যেন এক কঠিন লড়াই। বিষয়টি সবাই জানে, সরকারও অবগত-তবু সমাধানের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই, যা সাধারণ মানুষের কাছে চরম হয়রানি হিসেবেই ধরা দেয়।
সাঈদা আক্তার বলেন, আমরা দয়া চাই না। আমাদের বিনিয়োগ রক্ষা ও ভোক্তাদের ভোগান্তি কমাতে ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ চাই। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষ ও উদ্যোক্তা-উভয়ই।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাক মো. হাসিন পারভেজ বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নিজেই। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নভেম্বর ২০২৫-এ এলপিজি আমদানি ছিল ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন, ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে, মজুদ আছে, তবু বাজারে গ্যাস নেই! এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সংকটটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই সিন্ডিকেট কারা? আমদানি বাড়লেও সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে কারা জনগণের পকেট কাটছে? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), জ্বালানি বিভাগ ও প্রশাসনের নজরদারি কোথায়? শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় এড়ানো যাবে না।
এলপিজি সংকটের দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। অবিলম্বে আমদানি-সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা আনতে হবে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং অটোগ্যাসসহ সব খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এই জ্বালানি সংকট শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জনআস্থার চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।


















