এপস্টেইন ফাইল: এক বিতর্কিত কিশোরী যৌন পাচারের নথি এবং মার্কিন রাজনীতির প্রভাব
- আপডেট সময় : ০৯:৪৮:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও তার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি নথিপত্র বা ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে প্রথম তদন্ত শুরু হলেও, প্রভাব খাটিয়ে আপিল চুক্তির মাধ্যমে তিনি বড় সাজা থেকে রক্ষা পান। এ সময়ও তাকে যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
১১ বছর পর পুনরায় অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ব্যবহার করে যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন। বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে কারাগারে রহস্যজনকভাবে তার মৃত্যু হয়, যা পরে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং এপস্টেইনের বিভিন্ন সম্পত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র, ইমেইল ও ভিডিও সংগৃহীত হয়। বর্তমানে এই নথিগুলোকে ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বলা হচ্ছে। ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত নথিতে অন্তর্ভুক্ত আছে প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও।
নতুন ফাইলগুলোতে আছে কারাগারে থাকা অবস্থায় এপস্টিনের মানসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন, বন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য, এবং তার সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত সংক্রান্ত নথি। ম্যাক্সওয়েল অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে সহায়তার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এছাড়া নথিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এপস্টিনের ইমেইল যোগাযোগ, যা তার প্রভাব ও সংযোগের গভীরতা ফুটিয়ে তোলে।
অনেক নথি এক দশকের বেশি পুরোনো হলেও এ থেকে বোঝা যায়, আইনি ঝামেলার মধ্যেও এপস্টিন কীভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এফবিআই ও অন্যান্য তদন্ত সংস্থাগুলোর নজরদারির মধ্যেও তার অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক কার্যকর ছিল।
এপস্টেইন ফাইল শুধুই এক ব্যবসায়ীর অপরাধের দলিল নয়; এটি মার্কিন রাজনীতি, আইনি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ক্ষমতাশালীদের সংযোগ নিয়ে বিস্তৃত বিতর্কের একটি প্রতিচ্ছবি। এই নথি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও জনগণের নজর কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই বিতর্কের ওপর।
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রকাশিত নথিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামের উপস্থিতি। সেখানে তাদের বিকৃত যৌন আচরণ, কন্যা শিশু পাচার, শিশুদের ধর্ষণ, মানুষের মাংস খাওয়াসহ নানান বিতর্কিত তথ্য উঠে এসেছে। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় অভিযোগ, অনুমান ও তথ্য মিশে যাচ্ছে, তবে বাস্তবে আদালতের দৃষ্টিকোণে নাম থাকা মানে অপরাধ প্রমাণ নয়।
ফাইলগুলোতে ট্রাম্পের নামও উল্লেখ থাকায় এটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে এপস্টেইন প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন না।
এছাড়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রযুক্তি নেতা ইলন মাস্ক ও বিল গেটস-তাদের নাম নথিতে এসেছে। যদিও প্রত্যেকে দাবি করেছেন, তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে নথিতে তাদের উপস্থিতি বা যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। বিনোদন জগতের কিছু নামও এসেছে, যেমন মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস ইত্যাদি।
সম্প্রতি হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাটরা এপস্টেইন ও তার সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া কিছু ই-মেইল প্রকাশ করেছেন। ২০১১ সালের একটি ই-মেইলে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ থাকতে দেখা গেছে। প্রকাশিত ই-মেইল অনুযায়ী, একটি ভিক্টিম তার বাড়িতে ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে যে ওই ভিক্টিম হলেন ভার্জিনিয়া গিফ্রে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৃত্যুর আগে নিজেই গিফ্রে জানিয়েছিলেন তিনি ট্রাম্পকে কোনো অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত দেখতে পাননি। এর ফলে এখন পর্যন্ত ফাইলগুলোতে ট্রাম্পের সরাসরি কোনো অপরাধমূলক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এপস্টেইন ফাইলসের আলোচনায় এক ধরনের ভয়াবহ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কারণ এতে শুধু ট্রাম্প নয়, অনেক ধনকুবের, রাজনীতিবিদ, বিনোদন জগতের তারকা এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম আসে। যদিও আদালতে এখনো তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই, তবে নথির উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ই-মেইল ও যোগাযোগ বিষয়টি জনসাধারণের কৌতূহল ও সন্দেহ তৈরি করেছে। এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় নথি সংক্রান্ত ব্যাপক গুঞ্জন চলছে।
এই ফাইল ফাঁস হওয়ার পদ্ধতিটিও একটি আলোচনার বিষয়। অনেকেই মনে করছেন এটি হ্যাক বা গোপন লিকের ফল, কিন্তু বাস্তবে এটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার নথি আদালতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত ভুক্তভোগী ও সাংবাদিকদের আবেদন মেনে ধাপে ধাপে নথি প্রকাশের অনুমতি দেয়। ফলে জনসাধারণের নজরে এসেছে এই ফাইলগুলো, যা কোনো গোপন হ্যাক নয়, বরং আইনের স্বচ্ছতার অংশ।
জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ নেটওয়ার্কে ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি এপস্টেইনের সহযোগী হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার ও যৌন নিপীড়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ কিনে এক গোপন সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন জেফরি। তার এই সহযোগীর সঙ্গে নিলেই করতেন নারকীয় ও জঘন্য সব কর্মকাণ্ড।
এমনকি আদালতেও প্রমাণিত হয় যে, ম্যাক্সওয়েল এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সহায়তা করেছেন। এই রায় একদিকে ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের একটি ধাপ হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে এটি স্পষ্ট করে দেয় যে এপস্টেইন একা ছিলেন না।
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা শুধু নাম বা ব্যক্তির সঙ্গে যুক্তি প্রদর্শনের সীমাবদ্ধ নয়। এটি আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা, অর্থ এবং নৈতিকতার জটিল সম্পর্কও সামনে নিয়ে আসে। ক্ষমতাবানরা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধে জড়িত থেকেও আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করতে পারে, তা এখান থেকে স্পষ্ট হয়।


















