এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি
- আপডেট সময় : ০৮:২৪:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁর মূল্য প্রায় ১৫২ টাকা ধরলে, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ আমানত
এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর ২০২৫ সালেই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। গত এক দশকের হিসাবেও এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানতের অবস্থানে রয়েছে।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের নামে থাকা অর্থের মধ্যে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের বৈধ আমানত অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও সুইস ব্যাংক বা তাদের বিদেশি শাখাগুলোতে অর্থ জমা রাখেন। এসব অর্থও সুইজারল্যান্ডের আর্থিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দায় হিসেবে গণনা করা হয়।
এ কারণে সুইস ব্যাংকে থাকা সব অর্থই যে অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
অর্থ পাচার নিয়ে উদ্বেগ
এসএনবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ ও ২০২৩ সালে পরপর দুই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ওই দুই বছরে জমার পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি এবং পৌনে ২ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
এ বিষয়ে মইনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আশা করা হয়েছিল দেশ থেকে অর্থ পাচার কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য থেকে বোঝা যায়, অর্থ পাচার কমার স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, অর্থ পাচার শুধু সুইস ব্যাংকে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থ পাচার রোধের পাশাপাশি ইতোমধ্যে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। অন্যথায় অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
রাজনৈতিক পটভূমি ও সম্ভাব্য কারণ
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দলঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী দেশ ত্যাগ করেন। তাঁদের অনেকের সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রকাশিত অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রেও পূর্ববর্তী সময়ে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন উপায়ে সুইস ব্যাংকেও জমা হতে পারে।
সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তার পরিবর্তন
একসময় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো অর্থ পাচারকারীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ, দেশটির ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের তথ্য অন্য দেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করত না। তবে গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও তথ্য বিনিময়সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তির ফলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
বর্তমানে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারের অনুরোধে সুইজারল্যান্ড তথ্য সরবরাহ করে থাকে। ফলে অর্থ পাচারের কৌশলও বদলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের আড়ালে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
উপসংহার
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত এক বছরে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থ পাচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই অর্থের সবটাই অবৈধ বা পাচারকৃত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কারণ এর মধ্যে বৈধ ব্যাংক আমানত, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবুও অর্থ পাচার রোধ এবং বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।



















