আওয়ামী লীগ আমলে গুম: নিখোঁজ ২৫১, সম্ভাব্য মৃত্যু ২৮৭ অন্ধকার অধ্যায়ের ভয়াবহ হিসাব: কমিশন
- আপডেট সময় : ০২:৩৫:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে গতকাল রোববার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন : ছবি সংগ্রহ
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় সংঘটিত এক ভয়ংকর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন। আওয়ামী লীগের দেড় যুগের শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৫১ জন। তাঁদের আর ফেরার সম্ভাবনা নেই বলেই ধরে নিচ্ছে কমিশন। এ ছাড়া গুমের নির্দিষ্ট সময় পর ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় মোট ২৮৭টি মৃত্যুকে সরাসরি গুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় কমিশন। কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ সদস্যরা জানান, জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা প্রকৃত ঘটনার তুলনায় অনেক কম। কমিশনের মতে, তারা যে তথ্য পেয়েছে, তা মোট গুমের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ হতে পারে। এই হিসাবে দেশে গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে—যা দেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অপরাধ অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়।
কমিশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, গুম ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো আইনশৃঙ্খলা অভিযান নয়; বরং এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা একটি সংগঠিত দমননীতি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৯৭ শতাংশেরই রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৪৭৬ জন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৩৬ জন এবং বিএনপির ১৪২ জন নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। ছাত্রদল ও যুবদলের সদস্যরাও এই তালিকায় রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকেই প্রধান লক্ষ্য করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন বলছে, গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা। অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশেই র্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে গুমের পর ভুক্তভোগীরা তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এ নিহত হয়েছেন, আবার কারও মরদেহ নদী বা নির্জন স্থানে পাওয়া গেছে, গুলি ও নির্যাতনের চিহ্নসহ।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুমের শিকারদের প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ পুরুষ হলেও নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ২৩ জন। কমিশনের মতে, সামাজিক কলঙ্ক, ভয় ও চাপের কারণে নারী গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। অনেক পরিবার অভিযোগ করতেই সাহস পাননি।
কোন বছরে কত গুম হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কমিশনের বিশ্লেষণ একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা যায়, গুমের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ফল নয়; বরং রাজনৈতিক চাপ, নির্বাচন, নিরাপত্তার সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
কমিশনের তথ্য বলছে, ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ঘটেছে ১০টি, ২০১০ সালে ৩৪, ২০১১ সালে ৪৭, ২০১২ সালে ৬১, ২০১৩ সালে ১২৮, ২০১৪ সালে ৯৫, ২০১৫ সালে ১৪১, ২০১৬ সালে ২১৫, ২০১৭ সালে ১৯৪, ২০১৮ সালে ১৯২, ২০১৯ সালে ১১৮, ২০২০ সালে ৫১, ২০২১ সালে ৯৫, ২০২২ সালে ১১০, ২০২৩ সালে ৬৫ ও ২০২৪ সালে ৪৭টি।
কমিশনের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে গুমের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। ২০১২ সালের পর এই বৃদ্ধি তীব্র হয় এবং দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উচ্চমাত্রায় থাকে। ২০১৮ সালের পর সংখ্যায় কিছুটা হ্রাস দেখা যায়।
কমিশন সতর্ক করে বলেছে, এই বছরভিত্তিক চিত্রকে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক নথি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিশেষ করে ২০১২ সালের আগের সময়ের তথ্য প্রকৃত ঘটনার সর্বনিম্ন প্রতিফলন হতে পারে। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী, যাঁরা পরে ফিরে এসেছেন, ভয় ও মানসিক আঘাতের কারণে কমিশনের কাছে অভিযোগই করেননি।
কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৩ সালে গুমের ঘটনায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়, যা ২০১৪ সালের জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও। এমনকি জাতীয় নির্বাচন না থাকলেও ২০২২ সালে রাস্তায় আন্দোলন ও সংঘাতের সময় গুমের সংখ্যা আবার বাড়তে দেখা যায়।

















