অগণন চোখের জলে খালেদা জিয়ার বিদায়, ইতিহাসের এক অধ্যায়ের অবসান
- আপডেট সময় : ০৪:৩২:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২৯ বার পড়া হয়েছে
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে চিরঘুমে খালেদা জিয়ার শেষ যাত্রা
শোকের ভারে নুয়ে পড়ল দেশ, বিদায় নিলেন দেশনেত্রী
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে
লাখো মানুষের অশ্রু ও গুমরানো কান্নায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়
খালেদা জিয়ার জানাজা ও শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন
লাখো মানুষের অশ্রু ও গুমরানো কান্নায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা ও শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। জানাজা শেষে চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে চিরন্দ্রিায় শায়িত হন খালেদা জিয়া। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে খালেদা জিয়া ছিলেন এক গভীর আবেগ ও ইতিহাসের নাম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো মানুষ শীত উপেক্ষা করে জানাজায় অংশ নিতে ছুটে আসেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ লোকসমাগমের সাক্ষী রইল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে লাখো মানুষের ঢল নামে জাতীয় সংসদ ভবনের আশপাশজুড়ে। খালেদার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় অভূতপূর্ব কূটনৈতিক উপস্থিতি দেখা গেছে। বুধবার দুপুর ২টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় জানাজায় অন্তত ৩২টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কূটনীতিক অংশগ্রহণ করেন। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মেগান বোল্ডিন, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো সিগফ্রিড রেংলি, চীন, রাশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক। এছাড়া নেদারল্যান্ডস, ইতালি, সুইডেন, স্পেন, নরওয়ে, ব্রাজিল, ইরান, কাতার, ডেনমার্ক ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। কূটনীতিকদের পাশাপাশি বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্র মনি পান্ডে এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সিমোন লসন পার্চমেন্টও জানাজায় অংশ নেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বজায় রেখে তারা জানাজাস্থলে পৌঁছান। বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক কূটনীতিকের উপস্থিতি খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবেরই প্রতিফলন।

অগণন চোখের জলে খালেদা জিয়ার বিদায়
খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যবৃন্দ, জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমান, তিনবাহিনী প্রধান ছাড়াও লাখো মানুষ। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ শোক ও জনসমাগমে স্তব্ধ হয়ে উঠে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ শীত উপেক্ষা করে যোগ দেন। এদিকে ভোর থেকেই শোকাহত মানুষের স্রোতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। খালেদা জিয়ার জানাজায় কত মানুষ উপস্থিত এই প্রশ্নের কোনো পরিমাপযোগ্য উত্তর নেই। উপস্থিত জনতার ভাষায় একটাই শব্দ যথার্থ অগণন। ঢাকা মহানগরী ছাড়াও আশপাশের জেলা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় আগমন করেন। সফরকালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা পৌঁছে দেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকও ঢাকায় পৌঁছেছেন। তাঁর এই উপস্থিতিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সৌজন্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের এই অংশগ্রহণ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।
খালেদা জিয়ার জানাজায় ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের উপস্থিতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সৌহার্দ্য ও কূটনৈতিক সৌজন্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে প্রায় ৪০ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার ভোর ছয়টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সরকার বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করে এবং তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে। বুধবার বেলা পৌনে ১২টার পর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রবেশ করে পতাকায় মোড়ানো খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী গাড়িবহর। তার আগেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কানায় কানায় ভরে ওঠে। কেউ বাসে, কেউ মাইক্রোবাসে, কেউ আবার দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে জানাজাস্থলে পৌঁছান। সবার উদ্দেশ্য দেশনেত্রীকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানানো।

অগণন চোখের জলে খালেদা জিয়ার বিদায়
জানাজায় অংশ নিতে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে আসতে থাকেন। এতে আশপাশের সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহন আটকে পড়ায় অনেকেই কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে জানাজাস্থলে উপস্থিত হন। দুপুর ২টায় জানাজার সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জনসমাগম আরও বাড়তে থাকে। এর আগে সকালে গুলশানে তারেক রহমানের বাসভবনে নেওয়া হয় খালেদা জিয়ার মরদেহ। সেখানে পরিবারের সদস্য, স্বজন এবং দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শোকাবহ সেই মুহূর্তে পুরো বাসভবনজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে যোগ দিতে ঢাকায় পৌঁছান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। তিনি তারেক রহমানের কাছে ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা পৌঁছে দেন। এই উপস্থিতি শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে। জানাজা শেষে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে খালেদা জিয়াকে চন্দ্রিসা উদ্যানে, ক্রিসেন্ট লেকের তীরে তাঁর স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে স্বামীর কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হচ্ছেন তিনি। গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দেশনেত্রীর চিরবিদায়ে শোকে স্তব্ধ বাংলাদেশ। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে খালেদা জিয়া ছিলেন এক গভীর আবেগ ও ইতিহাসের নাম।



















