ঢাকা ১১:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা ব্যর্থতায় হামের প্রকোপ বেড়েছে: রাজশাহীতে স্বাস্থ্যবিষয়ক নেতার সতর্কবার্তা বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই,  গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেশি সংসদে হাসনাতের জন্ম-সালাহ  উদ্দিনের আগে আসার কাণ্ড! প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের  সৌজন্য, বিরোধীদলীয় নেতাকে স্বাগত দিয়ে প্রশংসা হাম প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, ৩৮ শিশুর প্রাণহানি মব কালচারের নামে নৈরাজ্য নয়, দাবি আদায়ে রাস্তা অবরোধে কঠোর বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যেভাবে সাইবার জালে ধরা পড়ল ৪০ কোটি: সিআইডির অভিযানে ফেরত এলো পাচার হওয়া অর্থ তেহরান থেকে দেশে  ফেরানো হলো  ১৮৬ বাংলাদেশিকে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার: এক দশকে ৬৮৩০ কোটি ডলার উধাও, বড় সংকেত অর্থনীতির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’দিনব্যাপী ইয়ং স্কলার কনফারেন্স শুরু হয়েছে

বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার: এক দশকে ৬৮৩০ কোটি ডলার উধাও, বড় সংকেত অর্থনীতির জন্য

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:২৮:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ ৩৭ বার পড়া হয়েছে

বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার: এক দশকে ৬৮৩০ কোটি ডলার উধাও, বড় সংকেত অর্থনীতির জন্য: ছিবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান

বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা বৈশ্বিক আর্থিক অখণ্ডতা (জিএফআই)-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২২-এই এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮.৩০ বিলিয়ন ডলার (৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে।

বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা) অনুযায়ী, এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলার বা ৮৩ হাজার ৮০০ কোটির বেশি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে, যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান।

প্রতিবেদনগুলো বলছে, আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিং) এই অর্থ পাচার করা হয়েছে। বাণিজ্য চ্যানেল ব্যবহার করায় বড় অঙ্কের অর্থ সহজেই বিদেশে সরানো সম্ভব হয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে আরও বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।

এই অর্থ পাচারের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাণিজ্যই প্রধান মাধ্যম: ৭৫ শতাংশ পাচার এই পথে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, মোট পাচারের প্রায় ৭৫ শতাংশই ঘটে বাণিজ্য খাতের মাধ্যমে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের আইন সংশোধনের পর চিহ্নিত ৯৫টি পাচারের ঘটনাই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে, যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

গবেষণায় আরও বলা হয়:

  • ২০০৯-২০১৮ সালে শুধুমাত্র মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে
  • ২০০৯-২০২৩ সময়ে বাণিজ্যের আড়ালে গড়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে
  • যা দেশের জিডিপির প্রায় ৩.৪ শতাংশের সমান

বিশেষ করে বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি আমদানিতে এই অনিয়ম বেশি ঘটে।

অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারাবাহিক অর্থ পাচার দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে

  • অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল হয়ে পড়ে
  • কর আদায় কমে যায়
  • জনসেবা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়
  • সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়

জিএফআইয়ের মতে, উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি, এবং পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যায়।

করণীয় কী?

প্রতিবেদনগুলোতে অর্থ পাচার রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে:

  • শুল্ক ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা
  • আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বাড়ানো
  • ব্যাংকিং খাতে মূল্য যাচাইয়ের ডেটাবেইস ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো
  • মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
  • বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করা
  • সারকথা: বাণিজ্যের আড়ালে চলা এই বিশাল অর্থ পাচার শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্যও এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার: এক দশকে ৬৮৩০ কোটি ডলার উধাও, বড় সংকেত অর্থনীতির জন্য

আপডেট সময় : ০৬:২৮:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান

বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা বৈশ্বিক আর্থিক অখণ্ডতা (জিএফআই)-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২২-এই এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮.৩০ বিলিয়ন ডলার (৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে।

বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা) অনুযায়ী, এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলার বা ৮৩ হাজার ৮০০ কোটির বেশি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে, যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান।

প্রতিবেদনগুলো বলছে, আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিং) এই অর্থ পাচার করা হয়েছে। বাণিজ্য চ্যানেল ব্যবহার করায় বড় অঙ্কের অর্থ সহজেই বিদেশে সরানো সম্ভব হয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে আরও বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।

এই অর্থ পাচারের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাণিজ্যই প্রধান মাধ্যম: ৭৫ শতাংশ পাচার এই পথে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, মোট পাচারের প্রায় ৭৫ শতাংশই ঘটে বাণিজ্য খাতের মাধ্যমে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের আইন সংশোধনের পর চিহ্নিত ৯৫টি পাচারের ঘটনাই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে, যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

গবেষণায় আরও বলা হয়:

  • ২০০৯-২০১৮ সালে শুধুমাত্র মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে
  • ২০০৯-২০২৩ সময়ে বাণিজ্যের আড়ালে গড়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে
  • যা দেশের জিডিপির প্রায় ৩.৪ শতাংশের সমান

বিশেষ করে বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি আমদানিতে এই অনিয়ম বেশি ঘটে।

অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারাবাহিক অর্থ পাচার দেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে

  • অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল হয়ে পড়ে
  • কর আদায় কমে যায়
  • জনসেবা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়
  • সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়

জিএফআইয়ের মতে, উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি, এবং পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ উন্নত অর্থনীতির দেশে চলে যায়।

করণীয় কী?

প্রতিবেদনগুলোতে অর্থ পাচার রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে:

  • শুল্ক ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা
  • আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বাড়ানো
  • ব্যাংকিং খাতে মূল্য যাচাইয়ের ডেটাবেইস ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো
  • মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
  • বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করা
  • সারকথা: বাণিজ্যের আড়ালে চলা এই বিশাল অর্থ পাচার শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্যও এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।