ঋতুরাজ বসন্ত মিলনমেলার উৎসব
- আপডেট সময় : ০৮:৪১:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ২১৭ বার পড়া হয়েছে
প্রকৃতিতে বয়ে চলে ফাল্গুনী হাওয়া
শীতের রুক্ষতা-রিক্ততা মুছে প্রকৃতিতে বয়ে চলে ফাল্গুনী হাওয়া
নিরাভরণ বৃক্ষে কচি কিশলয় জেগে উঠবার আভাসে আর বনতলে
কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে: আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…।
অনিরুদ্ধ
মাঘের শীতে বাঘ পালায়নি। বরং রাতে শীত দিনে গরম, প্রকৃতির এমন খেয়ালি পনার মধ্যেই মাঘ পেরিয়ে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ইটপাথরের নগরে বসন্তকে বরণ আয়োজন। দিনটি শুরুর ভোরেও কুয়াশা পড়েছে। সকালে শীত অনুভূত হয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে তা আবার উধাও। কিন্তু একেবারে শীত বিদায়ের নিশ্চিত বার্তা দেওয়া যাবে না। সবকিছুর পর, কথা একটাই ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত-।
চারুকলা অনুষদের সামনে অটোরিকশা থামলো ঠিক পৌনে সাতটা নাগাদ। নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই আয়োজনের বর্ণাঢ্য রঙ চোখে পড়ে। অথচ দুটো বছর এই রঙ বাহার উদাও ছিল। মানুষ ছিল চরম উৎকণ্ঠায়। চারিদিকে অজানা আতঙ্ক, মানুষে মানুষে দূরত্ব, সভ্যতা নিয়ে দুই বছর টানা হেছড়া করলো ভাইরাস। নাম তার করোনা-আর সংস্কার করা নাম কভিড-১৯।
গোটা পৃথিবীকে অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা থমকে দিয়েছিল। কিন্তু একটা সময়ে এসে তাও যখন নির্জীব, ঠিক তখনই ফাটতে শুরু করলো বারুদ! এক দেশ অপর দেশের ওপর বোমাসহ মারাণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। মানুষ মারা যাচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে স্থাপনাসহ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। পাল্টে গেল পৃথিবীর চেহারা। কঠিন পরিস্থিতি মুখোমুখি অর্থনীতি। করোনার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি, চরম আঘাতে উলোটপালোট হয়ে গেলো বিশ্বঅর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ।
এমন মুহুর্তে হাজির বসন্ত। বাঙালির প্রাণের উৎসব। সকালের স্নিগ্ধ আলোকে সঙ্গী করে বসন্ত রাগ বাজিয়ে ঋতুরাজকে বরণে দিনব্যাপী আয়োজনের পর্দা ওঠে। এরপর একে একে আবৃত্তি, নাচ, গান উপস্থিত দর্শকদের সকালের ক্লান্তি দূর করে দেয়। হলুদ-বাসন্তী শাড়ি, পাঞ্জাবি আর রঙিন ফুলে নিজেকে সাজিয়ে নানা বয়সের মানুষ হাজির হন বসন্ত উৎসবে। এবারে ঢাকায় তিনটি স্থানে উৎসবের আয়োজন করা করেছে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ।

দুই বছর পর মুক্ত পরিবেশে বসন্ত উৎসব ফিরে এলো আপন ঠিকানা বকুল তলায়। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বাঙালির উৎসবের ঠিকানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুল তলা। করোনার দুইবছর চারুকলা চত্বরে কোন আয়োজনের সুযোগ ছিল না।
বসন্ত উৎসব মঞ্চে যোগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আকতারুজ্জামান বছরের প্রতিটি দিনই যেন আমাদের মাঝে বসন্তের আমেজ বিরাজ করে সেই প্রত্যাশার কথন শোনান।
মানজার চৌধুরী সুইট যিনি ৩০ বছর ধরে বসন্ত উৎসবসহ নানা আয়োজন নিয়ে ক্লান্তিহীন ভাবে কাজ করে চলেছেন। বলেন, বাঙলায় রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বসন্ত উৎসব এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি বাঙালিকে তার আপন উৎসবের মহা সড়কে এক করে দিতে।

চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে মূল অনুষ্ঠানের আয়োজনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ভোরের আলোকে সঙ্গী করে তারুণ্যের ঢল নামে বকুলতলায়। দুই বছর পর মুক্ত পরিবেশে বসন্ত উৎসব ঘিরে ছিল সকল বয়সের মানুষের পদচারণা।
সমাজের ভিতরে বাহিরে যত দীন হচ্ছে মানুষও জীবনে-মননে ততই হতশ্রী হচ্ছে। বর্ষা বসন্তে তবু মানুষ বিমনা হয়, অজান্তে উৎফুল্ল হয়। কেউ হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে বাসন্তী রঙ বসনও তুলে নেয়। কিন্তু সকলে মিলে বসন্ত বরণ হয় না। প্রকৃতির সুরে-রঙে একাকার করে দিতেই পহেলা ফাল্গুন তথা বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে জাতীয় বসন্ত উদযাপন পরষদ।
ঋতুরাজের দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ ক্যাম্পাসজুড়ে তরুণ-তরুণী, যুগলসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় ছিল মুখরিত। এবারে পহেলা ফল্গুন ঘিরে ঢাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে বলে জানান শাহবাগ ফুল ব্যাবসায়ীরা।

কেবল যে ইট-পাথরের ঢাকায় বসন্ত উৎসবের আয়োজন হয়ে থাকে তা নয়, গোটা দেশটাই যেন একটা বসন্ত মঞ্চ। সারাদেশে ফুল বিক্রির পরিমানটা ৩০-৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবার কথা জানান ব্যবসায়ীরা।
শীতের রুক্ষতা-রিক্ততা মুছে প্রকৃতিতে বয়ে চলে ফাল্গুনী হাওয়া। চারুকলার বকুল তলার বসন্ত উৎসবের সুর-আবৃত্তি ছাড়িয়ে পরে চারিদিক। কানে ভেসে আসে-মাতাল হাওয়ায় কুসুম বনের বুকের কাঁপনে, উড়াল মৌমাছিদের ডানায় ডানায়, নিরাভরণ বৃক্ষে কচি কিশলয় জেগে উঠবার আভাসে আর বনতলে কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে: আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…।



















