ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ‘জয়’ এই শব্দটি বারবার ব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী রাষ্ট্রকে পরাস্ত করা কোনো দ্রুত বা সহজ কাজ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন একটি দেশ, যার শাসনব্যবস্থা শুধু ক্ষমতার কাঠামো নয়, বরং আদর্শ, ইতিহাস ও অস্তিত্বের প্রশ্নে গভীরভাবে প্রোথিত।
ইরান বর্তমানে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ইরানের ওপর হামলা হলে তেহরান চুপ করে থাকবে-এমন ধারণা মারাত্মক ভুল।
এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, আবার ২০২০ সালে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছে। তখনও ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন ও আরও বিপজ্জনক। বিশ্লেষকদের মতে, এবার সংঘাত শুরু হলে তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও রক্তক্ষয়ী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে তথাকথিত ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালালেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে দেশটি আরও সংঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, আঞ্চলিক ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলো সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বারবারা স্লাভিনের মতে, সব পথই বিপজ্জনক। একটির পর আরেকটি পদক্ষেপের ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনুমান করা কঠিন। ইরান যদি মনে করে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাহলে তারা ভয়ংকর জবাব দিতেও দ্বিধা করবে না।
ট্রাম্প অতীতে আইএস নেতা আল-বাগদাদি হত্যা, সোলাইমানিকে হত্যার মতো অভিযানের কথা উল্লেখ করে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গেও ইরানকে তুলনা করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তুলনা ভুল। ইরানের সামাজিক কাঠামো, সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব ভেনেজুয়েলার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পারসি স্পষ্ট করে বলেন, এটা ভেনেজুয়েলা নয়। এখানে দ্রুত কোনো বিজয়ের গল্প নেই। ইরানকে চাপে ফেলতে হলে বিপুল সামরিক শক্তি ও দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ তাদের শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি, তাহলে সীমিত হামলাও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। সেই সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট-ইরান কোনো দুর্বল রাষ্ট্র নয় যে সহজেই পরাস্ত করা যাবে। এই লড়াই শুধু শক্তির নয়, এটি ধৈর্য, স্থায়িত্ব ও পরিণতির প্রশ্ন। আর সেই পরিণতি যে ভয়াবহ হতে পারে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না।