ইরান অস্থির, দিল্লি উদ্বিগ্ন: খামেনির ভবিষ্যৎ ও ভারতের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
- আপডেট সময় : ০৭:৪৬:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
ইরানে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান ভারতের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; বরং এটি ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের কারণে স্থলপথে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ কার্যত অবরুদ্ধ। এই বাস্তবতায় ইরানই হয়ে উঠেছে ভারতের একমাত্র কার্যকর ভূখণ্ডগত সেতু। বিশেষ করে চাবাহার বন্দর প্রকল্পে ভারতের শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ দেশটির দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক কৌশলের প্রতীক। এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই ভারত আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-ইরান সম্পর্ক কখনোই আদর্শগত ছিল না; বরং তা বরাবরই বাস্তববাদী কৌশল ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলা এবং মধ্য এশিয়ায় নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে ইরান ভারতের জন্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে। শিয়া প্রধান ইরান আঞ্চলিক ভারসাম্যে পাকিস্তানের প্রভাব সীমিত রাখতে পরোক্ষভাবে ভারতকে সুবিধা দিয়ে এসেছে।
তবে ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীলতা এই সমীকরণকে নড়বড়ে করে তুলেছে। দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে কিংবা এমন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে, যা ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, তবে নয়াদিল্লির জন্য চাবাহারসহ সমগ্র মহাদেশীয় বাণিজ্য পথ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি রুপির ভারতীয় পণ্য ইরানের বন্দরে আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে, যা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—ইরানের শাসনব্যবস্থার পতনের পর সেখানে যদি উগ্রবাদী বা চরম অস্থিতিশীল শক্তির উত্থান ঘটে, তবে তা ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে, অস্থিরতার সুযোগে ইরান যদি আরও গভীরভাবে চীনের কৌশলগত বলয়ে প্রবেশ করে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এ প্রেক্ষাপটে ভারতের কাছে প্রশ্নটি আর শুধু খামেনির ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইরানের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশই এখন নয়াদিল্লির কৌশলগত উদ্বেগের কেন্দ্রে। ইরানের এই টালমাটাল পরিস্থিতি ভারতের কয়েক দশকের কূটনৈতিক বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক স্বপ্নকে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ করে দেবে কি না—সেই উত্তরই এখন খুঁজছেন ভারতের নীতিনির্ধারকরা।


















