ঢাকা ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সমর্থন করে: তৌহিদ হোসেন প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচার চাইলে গণতান্ত্রিক সরকার অপরিহার্য, তারেক রহমান গোপালগঞ্জ-৩: প্রার্থিতা ফিরে পেলেন হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ প্রামানিক কাঁদছে জলহারা প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র, বুকে তার ধু ধু বালুচর ৫৬ পর্যবেক্ষক মোতায়েন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে  এখনই অতি সতর্কতার প্রয়োজন নেই: ইইউ ইরান ভেনেজুয়েলা নয়: ট্রাম্পের জন্য সহজ নয় জয়ের পথ গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে তারেক রহমান, মানবিক আবেগে ভরা মতবিনিময় সভা খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জন’ দেওয়া হয়েছিল: ডা. এফ এম সিদ্দিকীর গুরুতর অভিযোগ কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ: রংপুরে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমাবেশ ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস: ঋণ-বিবাদে নৃশংসভাবে খুন মা ও কিশোরী মেয়ে

অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০১:০৫:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫ ৬১ বার পড়া হয়েছে

অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ : ছবি সংগ্রহ

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অ্যানথ্রাক্স সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া (ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস) আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কোচ। তিনি ১৮৭৬ সালে এই আবিষ্কার করেন, যা চিকিৎসা ব্যাকটেরিওলজির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল 

মানুষের জন‍্য অ্যানথ্রাক্স টিকা প্রথম আসে ১৯৫৪ সালে

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বিশেষজ্ঞরা অ্যানথ্রাক্সের এই ১১ রোগী শনাক্ত করেছেন। গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর তারা পীরগাছার ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় আটজনের অ্যানথ্রাক্স ধরা পড়ে। আর বুধবার (১ অক্টোবর) কাউনিয়ায় দুজন ও মিঠাপুকুরে একজন রোগী শনাক্ত হন 

প্রাণি চিকিৎসকদের মতে অ্যানথ্রাক্স একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক জীবাণুর কারণে হয়। এই জীবাণু মাটিতে বহু বছর সক্রিয় থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত গবাদিপশুর মৃতদেহ সঠিকভাবে পুঁতে না রাখলে রোগটি পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত এক গরু জবাইয়ের পর অন্তত ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে সাতজন গাইবান্ধা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, আর বাকিরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১০ সালে দেশের ১২টি জেলায় অ্যানথ্রাক্সে প্রায় ৫০০ জন আক্রান্ত হন, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব। পরবর্তীতে সরকার জাতীয় পর্যায়ে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ কর্মসূচি হাতে নেয় এবং নিয়মিত গবাদিপশু টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ফলে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে চলতি বছর আবারও উত্তরাঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি, নদীভাঙন ও মৃত পশুর যথাযথ দাফনের অভাবে ব্যাকটেরিয়া মাটিতে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ : ছবি সংগ্রহ
অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ : ছবি সংগ্রহ

কীভাবে ঘটল সংক্রমণ

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান জানান, ২৭ সেপ্টেম্বর কিশামত সদর গ্রামের মাহবুর রহমানের একটি অসুস্থ গরু হঠাৎ মারা যাওয়ার উপক্রম হলে সেটি জবাই করা হয়। এরপর গরুর মাংস প্রায় ১২০ জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। জবাই ও মাংস কাটাকাটির কাজে সরাসরি ১০-১৫ জন অংশ নেন। কয়েকদিন পর তাদের শরীরে ফোসকা, ঘা ও জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

তিনি বলেন, “প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম এটি সাধারণ চর্মরোগ। কিন্তু কয়েকজনের অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বোঝা যায় এটি অ্যানথ্রাক্স হতে পারে।” আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজন পরে গাইবান্ধা শহরের রাবেয়া ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোম এবং রাবেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি হন।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক জানান, বৃহস্পতিবার অন্তত পাঁচজন রোগী অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গাইবান্ধা বা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মঞ্জুরুল করিম প্রিন্স আক্রান্তদের পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে উপসর্গগুলো অ্যানথ্রাক্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, রোগীদের হাতে, মুখে, চোখে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোসকা, পচন, জ্বর, ব্যথা ও চুলকানি দেখা গেছে। এটি অ্যানথ্রাক্সের প্রাথমিক উপসর্গ। আক্রান্তদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনে তারা সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তিনি আরও জানান, অ্যানথ্রাক্স কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটি কেবল আক্রান্ত পশু জবাই, মাংস কাটাকাটি বা সংক্রমিত পশুর রক্ত ও চামড়ার সংস্পর্শে আসলে মানুষের শরীরে ছড়ায়। রান্না করা মাংস খাওয়ার মাধ্যমে এই রোগ সংক্রমিত হয় না।

গুরুতর আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন মোজা মিয়া, মোজাফফর মিয়া, শফিকুল ইসলাম ও মাহবুর রহমান। এদের মধ্যে দুজনের শরীরে বড় ধরনের ঘা ও সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।

অ্যানথ্রাক্স জীবাণু : ছবি সংগ্রহ
অ্যানথ্রাক্স জীবাণু : ছবি সংগ্রহ

প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগ

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মোজাম্মেল হক জানান, গাইবান্ধার পাশের পীরগাছা উপজেলায় সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। সেখান থেকেই সুন্দরগঞ্জে এটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে ঘাঘট ও তিস্তা নদীবেষ্টিত বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ, তারাপুর, বেলকা ও পৌরসভা এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে আমরা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছি। পাশাপাশি মৃত বা অসুস্থ পশু জবাই না করার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ডা. মোজাম্মেল আরও বলেন, অ্যানথ্রাক্স একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক জীবাণুর কারণে হয়। এই জীবাণু মাটিতে বহু বছর সক্রিয় থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত গবাদিপশুর মৃতদেহ সঠিকভাবে পুঁতে না রাখলে রোগটি পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, আক্রান্ত এলাকায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা স্থানীয়ভাবে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করছি। কেউ যাতে অসুস্থ পশু জবাই না করে, সেই বিষয়ে কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সরকারিভাবে টিকা সরবরাহ করা হচ্ছে। মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও চিকিৎসকরা ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করছেন।”

অ্যানথ্রাক্স : ছবি সংগ্রহ
অ্যানথ্রাক্স : ছবি সংগ্রহ

বাংলাদেশের অ্যানথ্রাক্সের ইতিহাস

বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্সের প্রথম প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয় ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে। এরপর ২০০৯ সালে সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীতে বড় আকারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে, যখন গবাদিপশুর মৃতদেহ ও চামড়া যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত টিকাদান ও সঠিকভাবে পশুর মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা। তারা পরামর্শ দিয়েছেন—

অসুস্থ বা মৃত পশু জবাই না করা,

সংক্রমিত স্থানে খোলা হাতে পশুর রক্ত বা মাংস স্পর্শ না করা,

সন্দেহজনক রোগ দেখা দিলে অবিলম্বে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে জানানো।

গাইবান্ধায় সাম্প্রতিক অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এখনো সতর্কতার ঘাটতি আছে। স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ ও চিকিৎসকদের দ্রুত ব্যবস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংক্রমণ রোধে জনগণের সচেতনতা ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।  স্থানীয় প্রশাসন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা  যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ

আপডেট সময় : ০১:০৫:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৫

অ্যানথ্রাক্স সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া (ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস) আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কোচ। তিনি ১৮৭৬ সালে এই আবিষ্কার করেন, যা চিকিৎসা ব্যাকটেরিওলজির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল 

মানুষের জন‍্য অ্যানথ্রাক্স টিকা প্রথম আসে ১৯৫৪ সালে

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বিশেষজ্ঞরা অ্যানথ্রাক্সের এই ১১ রোগী শনাক্ত করেছেন। গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর তারা পীরগাছার ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় আটজনের অ্যানথ্রাক্স ধরা পড়ে। আর বুধবার (১ অক্টোবর) কাউনিয়ায় দুজন ও মিঠাপুকুরে একজন রোগী শনাক্ত হন 

প্রাণি চিকিৎসকদের মতে অ্যানথ্রাক্স একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক জীবাণুর কারণে হয়। এই জীবাণু মাটিতে বহু বছর সক্রিয় থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত গবাদিপশুর মৃতদেহ সঠিকভাবে পুঁতে না রাখলে রোগটি পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত এক গরু জবাইয়ের পর অন্তত ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে সাতজন গাইবান্ধা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, আর বাকিরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১০ সালে দেশের ১২টি জেলায় অ্যানথ্রাক্সে প্রায় ৫০০ জন আক্রান্ত হন, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব। পরবর্তীতে সরকার জাতীয় পর্যায়ে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ কর্মসূচি হাতে নেয় এবং নিয়মিত গবাদিপশু টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ফলে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে চলতি বছর আবারও উত্তরাঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি, নদীভাঙন ও মৃত পশুর যথাযথ দাফনের অভাবে ব্যাকটেরিয়া মাটিতে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ : ছবি সংগ্রহ
অসুস্থ গরু কাটাকাটির পর গাইবান্ধায় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ : ছবি সংগ্রহ

কীভাবে ঘটল সংক্রমণ

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান জানান, ২৭ সেপ্টেম্বর কিশামত সদর গ্রামের মাহবুর রহমানের একটি অসুস্থ গরু হঠাৎ মারা যাওয়ার উপক্রম হলে সেটি জবাই করা হয়। এরপর গরুর মাংস প্রায় ১২০ জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। জবাই ও মাংস কাটাকাটির কাজে সরাসরি ১০-১৫ জন অংশ নেন। কয়েকদিন পর তাদের শরীরে ফোসকা, ঘা ও জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

তিনি বলেন, “প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম এটি সাধারণ চর্মরোগ। কিন্তু কয়েকজনের অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বোঝা যায় এটি অ্যানথ্রাক্স হতে পারে।” আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজন পরে গাইবান্ধা শহরের রাবেয়া ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোম এবং রাবেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি হন।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক জানান, বৃহস্পতিবার অন্তত পাঁচজন রোগী অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গাইবান্ধা বা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মঞ্জুরুল করিম প্রিন্স আক্রান্তদের পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন যে উপসর্গগুলো অ্যানথ্রাক্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, রোগীদের হাতে, মুখে, চোখে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোসকা, পচন, জ্বর, ব্যথা ও চুলকানি দেখা গেছে। এটি অ্যানথ্রাক্সের প্রাথমিক উপসর্গ। আক্রান্তদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনে তারা সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তিনি আরও জানান, অ্যানথ্রাক্স কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। এটি কেবল আক্রান্ত পশু জবাই, মাংস কাটাকাটি বা সংক্রমিত পশুর রক্ত ও চামড়ার সংস্পর্শে আসলে মানুষের শরীরে ছড়ায়। রান্না করা মাংস খাওয়ার মাধ্যমে এই রোগ সংক্রমিত হয় না।

গুরুতর আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন মোজা মিয়া, মোজাফফর মিয়া, শফিকুল ইসলাম ও মাহবুর রহমান। এদের মধ্যে দুজনের শরীরে বড় ধরনের ঘা ও সংক্রমণ দেখা দিয়েছে।

অ্যানথ্রাক্স জীবাণু : ছবি সংগ্রহ
অ্যানথ্রাক্স জীবাণু : ছবি সংগ্রহ

প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগ

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মোজাম্মেল হক জানান, গাইবান্ধার পাশের পীরগাছা উপজেলায় সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। সেখান থেকেই সুন্দরগঞ্জে এটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে ঘাঘট ও তিস্তা নদীবেষ্টিত বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ, তারাপুর, বেলকা ও পৌরসভা এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে আমরা জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছি। পাশাপাশি মৃত বা অসুস্থ পশু জবাই না করার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ডা. মোজাম্মেল আরও বলেন, অ্যানথ্রাক্স একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক জীবাণুর কারণে হয়। এই জীবাণু মাটিতে বহু বছর সক্রিয় থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত গবাদিপশুর মৃতদেহ সঠিকভাবে পুঁতে না রাখলে রোগটি পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, আক্রান্ত এলাকায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা স্থানীয়ভাবে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করছি। কেউ যাতে অসুস্থ পশু জবাই না করে, সেই বিষয়ে কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সরকারিভাবে টিকা সরবরাহ করা হচ্ছে। মানুষ যেন আতঙ্কিত না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও চিকিৎসকরা ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করছেন।”

অ্যানথ্রাক্স : ছবি সংগ্রহ
অ্যানথ্রাক্স : ছবি সংগ্রহ

বাংলাদেশের অ্যানথ্রাক্সের ইতিহাস

বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্সের প্রথম প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয় ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে। এরপর ২০০৯ সালে সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীতে বড় আকারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে, যখন গবাদিপশুর মৃতদেহ ও চামড়া যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত টিকাদান ও সঠিকভাবে পশুর মৃতদেহ ব্যবস্থাপনা। তারা পরামর্শ দিয়েছেন—

অসুস্থ বা মৃত পশু জবাই না করা,

সংক্রমিত স্থানে খোলা হাতে পশুর রক্ত বা মাংস স্পর্শ না করা,

সন্দেহজনক রোগ দেখা দিলে অবিলম্বে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে জানানো।

গাইবান্ধায় সাম্প্রতিক অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এখনো সতর্কতার ঘাটতি আছে। স্থানীয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ ও চিকিৎসকদের দ্রুত ব্যবস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংক্রমণ রোধে জনগণের সচেতনতা ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।  স্থানীয় প্রশাসন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা  যায়।