ঢাকা ০৯:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জিম্মি ভোক্তা ভোজ্যতেলের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিচার প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট হলো যুদ্ধের দমবন্ধ পরিস্থিতি পেরিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে বাংলাদেশের জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ দিল্লিতে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক, একান্ত আলোচনায় খলিলুর রহমান সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন ২০২৬ পাস যুদ্ধের সমাপ্তি নয় ‘আঙুল ট্রিগারেই’ যুদ্ধবিরতি নিয়ে মোজতবা খামেনির সতর্ক বার্তা ইরান যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে কাঁপছে ইসরায়েলি রাজনীতি: নেতানিয়াহুকে ‘ব্যর্থ’ বললেন লাপিদ আজ রাতেই একটি গোটা সভ্যতার ধ্বংস হবে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ৪ অধ্যাদেশ রহিতের সুপারিশে জনমনে উদ্বেগ, আরও যাচাইয়ের পক্ষে এমপিরা গ্রেফতার সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে 

নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিচার প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট হলো

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৩:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬ ৭২ বার পড়া হয়েছে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন আইনের ফলে জুলাই আন্দোলনের পর থেকে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বহাল থাকছে। অর্থাৎ, এই আইনের বলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনা যাবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে নতুন আইনগত পদক্ষেপ।

বুধবার  সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘হাসিনা হঠাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে। ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দেশত্যাগ করেন। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে সংঘটিত সহিংসতায় বহু প্রাণহানি ঘটে, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রতিবেদনে আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুম, খুন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয় এবং দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশে নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিচার প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট হলো
ফা্িলি ছবি

সর্বশেষ পাস হওয়া সংশোধিত আইনে সরকারকে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের পাশাপাশি তাদের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে প্রচারণা, সভা-সমাবেশ বা জনসম্মুখে বক্তব্য দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন এই আইন একদিকে যেমন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে।

বিলটি পাসের সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে চাইলে তা বিধিসম্মত না হওয়ায় স্পিকার অনুমতি দেননি। তবে এই সময় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একটি শিট আমরা তিন-চার মিনিট আগে হাতে পেয়েছি।

এখনো পড়তে পারিনি। যেহেতু আইনটা অবশ্যই সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) আইন। আমরা কি অনুরোধ করতে পারি যে, বিলটি পাসের আগে সময় রেখে একটু সুযোগ দেওয়া হোক।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রুলিং দিয়ে বলেন, বিলের এই পর্যায়ে এসে আপত্তি করার সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে আপত্তি বা প্রস্তাব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, যা দেওয়া হয়নি।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এই বিলটা হলো একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত একটি অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধনী)। আগের যে আইন ছিল সন্ত্রাসবিরোধী আইন সেটা সংশোধনের জন্য।

বিরোধী দলীয় নেতার স্মরণে থাকার কথা যে ওনারা এবং এনসিপির বন্ধুরা মিলে আন্দোলনের মাধ্যমে একটি জনমত তৈরি করেছিলেন। সেই জনমতের প্রেক্ষিতেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই আইনের বলেই একটি রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ) রেজিস্ট্রেশন বর্তমানে স্থগিত আছে। এমনকি আইসিটি অ্যাক্টেও পরিবর্তন আনা হয়েছে সংগঠনের বিচারের জন্য।

মন্ত্রী আরও বলেন, সংশোধনী দেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। এখন আলোচনা করতে চাইলে বিলের প্রথম বা দ্বিতীয় পাঠের সময় প্রস্তাব দেওয়া উচিত ছিল।

মন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকারের নির্দেশনায় বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করা হয় এবং কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।

আইনটি পাসের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি পেল। ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

সেই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের ভিত্তিতে কার্যকর ছিল। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে সংশোধিত আকারে সংসদে আইন হিসেবে পাসের সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশের আলোকে বিলটি সংসদে উত্থাপন ও পাস করা হয়।

আইনে যা বলা হয়েছে

আইনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে উল্লেখ করে বিলে বলা হয়, ২০০৯ সনের ১৬ নং আইনের ধারা ১৮ এর সংশোধন। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ১৬ নং আইন), অতঃপর উক্ত আইন বলিয়া উল্লিখিত, এর ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত ‘সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে’ শব্দগুলির পর ‘বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করিতে পারিবে’ শব্দগুলি সংযোজিত হইবে।

২০০৯ সনের ১৬ নং আইনের ধারা ২০ এর সংশোধন। উক্ত আইনের ধারা ২০ এর (ক) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত ‘যদি কোনো ব্যক্তিকে ধারা ১৮ এর বিধান অনুসারে তালিকাভুক্ত করা হয় বা কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ করা হয়’ শব্দগুলি ও সংখ্যার পরিবর্তে ‘যদি কোনো ব্যক্তি বা সত্তার বিরুদ্ধে ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়’ শব্দগুলি, সংখ্যাগুলি ও বন্ধনী প্রতিস্থাপিত হইবে;
(খ) উপ-ধারা (১) এর
(অ) দফা (গ)-তে উল্লিখিত ‘নিষিদ্ধ’ শব্দের পরিবর্তে ‘উক্ত’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হইবে; এবং
(আ) দফা (ঙ) এর পরিবর্তে নিম্নরূপ দফা (ঙ) প্রতিস্থাপিত হইবে, যথা :-
‘(ঙ) উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যে কোনো প্রেস বিবৃতির
প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য যে কোনো মাধ্যমে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।’

আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিলে বলা হয়, কতিপয় সন্ত্রাসী কার্য প্রতিরোধ এবং উহাদের কার্যকর শাস্তির বিধানসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়ন করার নিমিত্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়। উক্ত আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যের সহিত জড়িত রহিয়াছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারে।

তবে বর্তমান আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে কোনো বিধান নেই। উক্ত বিষয়টি স্পষ্টীকরণের বিধান সংযোজন আবশ্যক হেতু সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯-কে সময়োপযোগী করে উক্ত আইনের অধিকতর সংশোধন সমীচীন ও প্রয়োজন হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ আইনের ১৮ ও ২০ ধারা সংশোধনপূর্বক ১১/০৫/২০২৬ তারিখে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

যেভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

পরে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, অভ্যুত্থানের সময় প্রায় ১৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন।

তাদের বেশিরভাগের মৃত্যু হয়েছে রাইফেল ও শটগানের গুলিতে। ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাদের নির্দেশেই বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

এসব হত্যাকাণ্ডসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হাসিনাসহ অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হতে থাকে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান করতে চাইলে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে। ওই দাবিতে ২০২৫ সালের মে মাসে জোরালো আন্দোলন শুরু হয়।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১০ মে রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১২ মে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

গেজেটে উল্লেখ করা হয়, অভ্যুত্থান দমনে ‘গুম, খুন, পুড়িয়ে হত্যা, গণহত্যা, বেআইনি আটক, অমানবিক নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশে মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা সংগঠনের পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান সংযোজন করা হয়। আজ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলের মাধ্যমে ওই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হলো।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিচার প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট হলো

আপডেট সময় : ০৬:৩৩:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন আইনের ফলে জুলাই আন্দোলনের পর থেকে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বহাল থাকছে। অর্থাৎ, এই আইনের বলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনা যাবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে নতুন আইনগত পদক্ষেপ।

বুধবার  সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘হাসিনা হঠাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে। ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দেশত্যাগ করেন। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে সংঘটিত সহিংসতায় বহু প্রাণহানি ঘটে, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রতিবেদনে আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুম, খুন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয় এবং দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশে নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বিচার প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট হলো
ফা্িলি ছবি

সর্বশেষ পাস হওয়া সংশোধিত আইনে সরকারকে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের পাশাপাশি তাদের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে প্রচারণা, সভা-সমাবেশ বা জনসম্মুখে বক্তব্য দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন এই আইন একদিকে যেমন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে।

বিলটি পাসের সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে চাইলে তা বিধিসম্মত না হওয়ায় স্পিকার অনুমতি দেননি। তবে এই সময় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একটি শিট আমরা তিন-চার মিনিট আগে হাতে পেয়েছি।

এখনো পড়তে পারিনি। যেহেতু আইনটা অবশ্যই সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর) আইন। আমরা কি অনুরোধ করতে পারি যে, বিলটি পাসের আগে সময় রেখে একটু সুযোগ দেওয়া হোক।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রুলিং দিয়ে বলেন, বিলের এই পর্যায়ে এসে আপত্তি করার সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে আপত্তি বা প্রস্তাব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, যা দেওয়া হয়নি।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এই বিলটা হলো একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত একটি অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধনী)। আগের যে আইন ছিল সন্ত্রাসবিরোধী আইন সেটা সংশোধনের জন্য।

বিরোধী দলীয় নেতার স্মরণে থাকার কথা যে ওনারা এবং এনসিপির বন্ধুরা মিলে আন্দোলনের মাধ্যমে একটি জনমত তৈরি করেছিলেন। সেই জনমতের প্রেক্ষিতেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই আইনের বলেই একটি রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ) রেজিস্ট্রেশন বর্তমানে স্থগিত আছে। এমনকি আইসিটি অ্যাক্টেও পরিবর্তন আনা হয়েছে সংগঠনের বিচারের জন্য।

মন্ত্রী আরও বলেন, সংশোধনী দেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। এখন আলোচনা করতে চাইলে বিলের প্রথম বা দ্বিতীয় পাঠের সময় প্রস্তাব দেওয়া উচিত ছিল।

মন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকারের নির্দেশনায় বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করা হয় এবং কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।

আইনটি পাসের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি পেল। ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

সেই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের ভিত্তিতে কার্যকর ছিল। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে সংশোধিত আকারে সংসদে আইন হিসেবে পাসের সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশের আলোকে বিলটি সংসদে উত্থাপন ও পাস করা হয়।

আইনে যা বলা হয়েছে

আইনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে উল্লেখ করে বিলে বলা হয়, ২০০৯ সনের ১৬ নং আইনের ধারা ১৮ এর সংশোধন। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ১৬ নং আইন), অতঃপর উক্ত আইন বলিয়া উল্লিখিত, এর ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত ‘সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে’ শব্দগুলির পর ‘বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করিতে পারিবে’ শব্দগুলি সংযোজিত হইবে।

২০০৯ সনের ১৬ নং আইনের ধারা ২০ এর সংশোধন। উক্ত আইনের ধারা ২০ এর (ক) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত ‘যদি কোনো ব্যক্তিকে ধারা ১৮ এর বিধান অনুসারে তালিকাভুক্ত করা হয় বা কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ করা হয়’ শব্দগুলি ও সংখ্যার পরিবর্তে ‘যদি কোনো ব্যক্তি বা সত্তার বিরুদ্ধে ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়’ শব্দগুলি, সংখ্যাগুলি ও বন্ধনী প্রতিস্থাপিত হইবে;
(খ) উপ-ধারা (১) এর
(অ) দফা (গ)-তে উল্লিখিত ‘নিষিদ্ধ’ শব্দের পরিবর্তে ‘উক্ত’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হইবে; এবং
(আ) দফা (ঙ) এর পরিবর্তে নিম্নরূপ দফা (ঙ) প্রতিস্থাপিত হইবে, যথা :-
‘(ঙ) উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যে কোনো প্রেস বিবৃতির
প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য যে কোনো মাধ্যমে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।’

আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিলে বলা হয়, কতিপয় সন্ত্রাসী কার্য প্রতিরোধ এবং উহাদের কার্যকর শাস্তির বিধানসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়ন করার নিমিত্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়। উক্ত আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যের সহিত জড়িত রহিয়াছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারে।

তবে বর্তমান আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে কোনো বিধান নেই। উক্ত বিষয়টি স্পষ্টীকরণের বিধান সংযোজন আবশ্যক হেতু সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯-কে সময়োপযোগী করে উক্ত আইনের অধিকতর সংশোধন সমীচীন ও প্রয়োজন হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ আইনের ১৮ ও ২০ ধারা সংশোধনপূর্বক ১১/০৫/২০২৬ তারিখে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

যেভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

পরে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, অভ্যুত্থানের সময় প্রায় ১৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন।

তাদের বেশিরভাগের মৃত্যু হয়েছে রাইফেল ও শটগানের গুলিতে। ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাদের নির্দেশেই বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

এসব হত্যাকাণ্ডসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হাসিনাসহ অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হতে থাকে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান করতে চাইলে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে। ওই দাবিতে ২০২৫ সালের মে মাসে জোরালো আন্দোলন শুরু হয়।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১০ মে রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১২ মে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

গেজেটে উল্লেখ করা হয়, অভ্যুত্থান দমনে ‘গুম, খুন, পুড়িয়ে হত্যা, গণহত্যা, বেআইনি আটক, অমানবিক নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশে মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা সংগঠনের পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান সংযোজন করা হয়। আজ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলের মাধ্যমে ওই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হলো।