সাত বছরে সড়কে ঝরেছে ৭,৯৬৩ শিশুর প্রাণ, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়
- আপডেট সময় : ০৬:৪১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
সড়কে প্রতিদিনই ছুটছে অসংখ্য যানবাহন, অথচ সেই সড়কই কেড়ে নিচ্ছে হাজারো শিশুর প্রাণ। গত সাত বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৯৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে। পথচারী হিসেবে প্রাণ গেছে ২ হাজার ৮১২ শিশুর। আর বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে আরও ২ হাজার ১৯৩ শিশু। এসব পরিসংখ্যান দেশের সড়ক নিরাপত্তা এবং শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। এ ছাড়া পথচারী হিসেবেও বিপুলসংখ্যক শিশু প্রাণ হারিয়েছে। নিহত শিশুদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশই ছিল পথচারী। অর্থাৎ সড়কে হেঁটে চলাচল করার সময়ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
পথচারী শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে থ্রি-হুইলারের ধাক্কা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এ ধরনের যানবাহনের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ২৭১ শিশু। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় প্রাণ গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশুর। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে।
এসব তথ্য বলছে, শিশুদের সড়ক পারাপার, হাঁটাচলা এবং যানবাহনে ওঠানামার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা ও আবাসিক এলাকার সড়কে শিশুদের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শিশু নিহত হয়েছে গ্রামীণ সড়কে। এ ধরনের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮২ শিশু, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু।
গ্রামীণ সড়কে বসতবাড়ি, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করলেও অনেক স্থানে গতি নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার ও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, এসব সড়কে নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাও শিশুদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিকালে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু। এ ছাড়া রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথও অনিরাপদ
শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আরেকটি বড় ক্ষেত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে ২ হাজার ৫১৩ শিশু নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় প্রাণ গেছে ৯৬২ শিশুর।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত এবং চালকদের সতর্কতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের সড়কে শিশুদের চলাচল ও খেলাধুলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতার অভাব এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা পেতে সংকটও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়কে বসতবাড়ির কাছাকাছি দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করলেও অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয় না। এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ও নজরদারি সীমিত থাকায় শিশুরা সহজেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থাকে নিরাপদ ও শিশুবান্ধব করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে বিশেষ সরকারি তহবিল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয় না, সমাজকেও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলে। সাত বছরে প্রায় আট হাজার শিশুর প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান তাই কেবল দুর্ঘটনার হিসাব নয়; এটি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতিরও বড় সতর্কবার্তা। শিশুদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, চালকদের দায়িত্বশীলতা এবং উন্নত জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।













