জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার হবেই, তবে প্রতিশোধ নয়: প্রধানমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ১০:১০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬ ৪০ বার পড়া হয়েছে
জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার অবশ্যই হবে, তবে তা কোনোভাবেই প্রতিশোধমূলক বা বিচারের নামে অবিচারে পরিণত হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আইন ও ন্যায়বিচারের নীতিমালা অনুসরণ করেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই না বিচারের নামে আরেকটি অবিচার হোক। যারা অপরাধ করেছে, যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার অবশ্যই হবে। তবে সেই বিচার হতে হবে আইনের শাসনের ভিত্তিতে, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায়।’
তিনি জানান, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনে ৬৫ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে। মানুষ এখন একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র দেখতে চায়।
শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের বিচার অবশ্যই হবে। তবে সেই বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, ন্যায়সংগতভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।
আবেগঘন বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘একজন মা নিজের সন্তানকে গুলি করে হত্যা হতে দেখেছেন, কেউ দেখেছেন সন্তানকে আগুনে পুড়ে মরতে, কেউ হারিয়েছেন ভাই কিংবা স্বজনকে। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আপনাদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট আমি অন্তত অনুভব করতে পারি।’
তিনি বলেন, রাষ্ট্র চাইলে অনেক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু হারানো স্বজনকে ফিরিয়ে দিতে পারে না, ফিরে আসে না হারানো দৃষ্টিশক্তি কিংবা শারীরিক ক্ষতি। তবে শহীদদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে দেশকে এগিয়ে নেওয়াই হবে তাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারবে—এই দেশের পরিবর্তন এসেছে শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে।’
প্রতিশোধের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘যদি আজ আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, গত ১৭ বছরে তাঁর ওপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিশোধ তিনি চান কি না, আমি নিশ্চিত তিনি বলতেন—প্রতিশোধ নয়, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে যাও।’ একইভাবে নিজের ভাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিনিও বিশ্বাস করেন, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, দেশকে এগিয়ে নেওয়াই হবে অন্যায়ের সর্বোত্তম জবাব।
তারেক রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনে মানুষ রাজপথে নেমেছিল এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে, যেখানে সবাই মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবে। আজ পরিবর্তনের এই সময়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী, স্বাধীনতাপ্রিয় ও শান্তিকামী মানুষের সম্মিলিত অর্জন।’
বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ত্যাগ সেই করতে পারে, যার ত্যাগ করার সাহস ও শক্তি আছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কর্মীদের সেই সাহস রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য আমি নয়, আমরা। আমাদের লক্ষ্য দেশ, দেশের মানুষ এবং দেশের মাটি। জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধা এবং গত ১৭ বছরের আন্দোলনের সব যোদ্ধার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে তাদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সবশেষে সবাইকে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সম্মেলন থেকে আমাদের শপথ হোক—কোনো বিভাজন নয়, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাব।’
সম্মেলনে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।









