ঢাকা ০১:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আজ থেকে নতুন নীতিমালা: রোহিঙ্গা সহায়তায় ধস, বাড়ছে মানবিক শঙ্কা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরান: কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা ঘিরে তীব্র উত্তেজনা জরিপ দ্রুত ইরান যুদ্ধের অবসান চান ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক কয়েক সপ্তাহেই শেষ হতে পারে ইরান যুদ্ধ: রুবিওর দাবি চাঁদের পথে নতুন দিগন্ত: অ্যাপোলোর পর আর্টেমিসে ইতিহাস গড়ার অভিযাত্রা অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা ব্যর্থতায় হামের প্রকোপ বেড়েছে: রাজশাহীতে স্বাস্থ্যবিষয়ক নেতার সতর্কবার্তা বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই,  গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেশি সংসদে হাসনাতের জন্ম-সালাহ  উদ্দিনের আগে আসার কাণ্ড! প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের  সৌজন্য, বিরোধীদলীয় নেতাকে স্বাগত দিয়ে প্রশংসা হাম প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, ৩৮ শিশুর প্রাণহানি

আজ থেকে নতুন নীতিমালা: রোহিঙ্গা সহায়তায় ধস, বাড়ছে মানবিক শঙ্কা

ভয়েস ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:০২:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

রোহিঙ্গা সহায়তায় ধস, বাড়ছে মানবিক শঙ্কা: ফাইল ছবি

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়নে ধারাবাহিকভাবে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সহায়তার পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে আসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে’

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশে অবস্থানরত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মানবিক পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের মুখে পড়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে যেখানে বার্ষিক সহায়তা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল, তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০০ মিলিয়ন ডলারে।

এতে করে শরণার্থীদের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় একটি নতুন নীতিমালা চালু করেছে, যা আজ (১ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় শরণার্থীদের তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে সহায়তা প্রদান করা হবে, যার লক্ষ্য সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

নীতিমালা অনুযায়ী, আগে যেখানে জনপ্রতি মাসে ১২ ডলার সমপরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হতো, এখন তা কমিয়ে তিন ধাপে ভাগ করা হয়েছে, ৭ ডলার, ১০ ডলার এবং ১২ ডলার।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে প্রতি মাসে মাথাপিছু ৭ ডলার করে দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ধাপে থাকা প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ ১২ ডলার সহায়তা পাবে; এর মধ্যে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, শিশু-নেতৃত্বাধীন পরিবার এবং বয়স্ক সদস্য থাকা পরিবারগুলো অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে আরও ৩ ডলার পাবে।

বাকি ৫০ শতাংশ শরণার্থীকে তৃতীয় ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে মাথাপিছু ১০ ডলার করে দেওয়া হবে।

এই নতুন কাঠামো কক্সবাজার এবং ভাসানচর-এ বসবাসরত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জন্য রেশন ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা নেতারা এই ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতিসংঘ-এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যা ইতিহাসের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, যদিও অনিবন্ধিত আরও অনেক শরণার্থী রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান-এর আওতায় পরিচালিত বার্ষিক ত্রাণ কর্মসূচির বাজেট ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন আসত বিভিন্ন দাতা দেশ থেকে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অর্থায়নে ধারাবাহিকভাবে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সহায়তার পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে আসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চলতি বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও এখনো পর্যাপ্ত অর্থায়নের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

মো. মিজানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার, সতর্ক করে বলেছেন যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।

তাঁর মতে, খাদ্য সহায়তা কমে গেলে পুষ্টিহীনতা বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক রোহিঙ্গা জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হতে পারে, যা সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।

এদিকে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের এই নীতিমালাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

তাঁর মতে, খাদ্য সহায়তায় এ ধরনের বৈষম্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে এবং জীবিকার তাগিদে অনেকে স্থানীয় সমাজে সম্পৃক্ত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রমহ্রাসমান আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং বাড়তে থাকা শরণার্থী সংখ্যা একত্রে একটি জটিল মানবিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই অর্থায়ন, সমন্বিত নীতি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

আজ থেকে নতুন নীতিমালা: রোহিঙ্গা সহায়তায় ধস, বাড়ছে মানবিক শঙ্কা

আপডেট সময় : ১২:০২:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়নে ধারাবাহিকভাবে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সহায়তার পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে আসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে’

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশে অবস্থানরত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মানবিক পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের মুখে পড়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে যেখানে বার্ষিক সহায়তা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল, তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০০ মিলিয়ন ডলারে।

এতে করে শরণার্থীদের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় একটি নতুন নীতিমালা চালু করেছে, যা আজ (১ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় শরণার্থীদের তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে সহায়তা প্রদান করা হবে, যার লক্ষ্য সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

নীতিমালা অনুযায়ী, আগে যেখানে জনপ্রতি মাসে ১২ ডলার সমপরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হতো, এখন তা কমিয়ে তিন ধাপে ভাগ করা হয়েছে, ৭ ডলার, ১০ ডলার এবং ১২ ডলার।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে প্রতি মাসে মাথাপিছু ৭ ডলার করে দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ধাপে থাকা প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ ১২ ডলার সহায়তা পাবে; এর মধ্যে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, শিশু-নেতৃত্বাধীন পরিবার এবং বয়স্ক সদস্য থাকা পরিবারগুলো অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে আরও ৩ ডলার পাবে।

বাকি ৫০ শতাংশ শরণার্থীকে তৃতীয় ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে মাথাপিছু ১০ ডলার করে দেওয়া হবে।

এই নতুন কাঠামো কক্সবাজার এবং ভাসানচর-এ বসবাসরত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জন্য রেশন ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা নেতারা এই ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতিসংঘ-এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যা ইতিহাসের অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট হিসেবে বিবেচিত।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, যদিও অনিবন্ধিত আরও অনেক শরণার্থী রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান-এর আওতায় পরিচালিত বার্ষিক ত্রাণ কর্মসূচির বাজেট ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন আসত বিভিন্ন দাতা দেশ থেকে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অর্থায়নে ধারাবাহিকভাবে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সহায়তার পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে আসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চলতি বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও এখনো পর্যাপ্ত অর্থায়নের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

মো. মিজানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার, সতর্ক করে বলেছেন যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।

তাঁর মতে, খাদ্য সহায়তা কমে গেলে পুষ্টিহীনতা বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক রোহিঙ্গা জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হতে পারে, যা সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।

এদিকে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের এই নীতিমালাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

তাঁর মতে, খাদ্য সহায়তায় এ ধরনের বৈষম্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে এবং জীবিকার তাগিদে অনেকে স্থানীয় সমাজে সম্পৃক্ত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রমহ্রাসমান আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং বাড়তে থাকা শরণার্থী সংখ্যা একত্রে একটি জটিল মানবিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই অর্থায়ন, সমন্বিত নীতি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।