এলপিজি ঘিরে নীরব অর্থনৈতিক সন্ত্রাসে জিম্মি ভোক্তা, কঠোর পদক্ষেপের দাবি
- আপডেট সময় : ১২:৫৯:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৮ বার পড়া হয়েছে
দেশের বাজারব্যবস্থায় এখন সবচেয়ে বড় সংকটের নাম সিন্ডিকেট। উৎপাদন ব্যয় কমলেও পণ্যের দাম কমে না, আন্তর্জাতিক বাজারে দর নামলেও দেশের ভোক্তারা তার সুফল পান না। কারণ, একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ, যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও হুমকিস্বরূপ।
চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, আলু, ডিম কিংবা এলপিজি নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের বাজারেই অভিযোগ একই। কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী গোপন সমঝোতার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি ও একযোগে দাম বাড়িয়ে তারা মুনাফার পাহাড় গড়ছে। এতে প্রতিদিন ভোক্তার পকেটে সরাসরি হাত পড়ছে।
চাহিদা-জোগানের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। উৎপাদন খরচ কমলেও দাম কমে না, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের খবর এলেও তার কোনো প্রভাব পড়ে না দেশের খুচরা বাজারে। এর সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ-বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
ঢাকার সেগুন বাগিচার জসিমউদ্দিন জানায়, একমাসের ব্যবধানে ৪০০০ টাকার ৩৫ কেজির এলপিজি গ্যাস কিনতে হচ্ছে ৫০০০ হাজার টাকায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তোপখানা রোডের একজন হোটেল মালিক বলেন, এলপিজি গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবারের দামও বাড়াতে হচ্ছে।
বাজারে পণ্যদাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার ব্যয় দ্বিগুণে দাড়িয়েছে। সংসার চালাতে গিয়ে সব দিকেই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এমন কথা আজ শুধু একজনের নয়, এটাই এখন দেশের হাজারো পরিবারের বাস্তব চিত্র।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ। মানুষ খাদ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টির মতো মৌলিক খাত থেকে সরে আসছে। এর ফলে মানবসম্পদের মান কমবে, বাড়বে সামাজিক বৈষম্য। অথচ এই সংকটের পেছনে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক বিপর্যয় নেই, আছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর পরিকল্পিত কারসাজি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেট শুধু ভোক্তাকেই নয়, রাষ্ট্রকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সরকারি ঘোষণা, মূল্যনির্ধারণ কিংবা তদারকি কোনো কিছুকেই তারা তোয়াক্কা করছে না। নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ভুলে গিয়ে তারা নিজেদের ব্যবসায়িক নায়ক ভাবছে, অথচ বাস্তবে তারা সাধারণ মানুষের কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে মুনাফা লুটছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজার তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জরিমানার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ধরলে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। সিন্ডিকেটের নেপথ্যের হোতাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ডিজিটাল নজরদারি, মজুতের তথ্য প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন কাগজে নয়, মাঠে কার্যকর না হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার যদি সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও সাফল্যের সব পরিসংখ্যান অর্থহীন হয়ে পড়বে। কারণ বাজার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের। ভোক্তার ঘাম ঝরানো টাকায় কেউ ব্যবসায়িক রাজত্ব কায়েম করতে পারে না।
এখন প্রশ্ন একটাই সরকার কি ভোক্তার পক্ষে কঠোর অবস্থান নেবে, নাকি সিন্ডিকেটের এই নীরব অর্থনৈতিক সন্ত্রাস আরও বিস্তৃত হবে? সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে দৃঢ় সিদ্ধান্তের দিকে।


















