যুদ্ধের দমবন্ধ পরিস্থিতি পেরিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে বাংলাদেশের জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন পারস্য উপসাগরে আটকে থাকার পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় জাহাজটি আবারও যাত্রা শুরু করেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের উদ্দেশ্যে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)-এর মালিকানাধীন এই জাহাজটি বুধবার ভোরে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে নোঙর তুলে যাত্রা শুরু করে। ঘণ্টায় প্রায় ১২ নটিক্যাল মাইল গতিতে এগিয়ে চলা জাহাজটি বর্তমানে হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৪০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছে। নাবিকদের আশা, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যেই তারা প্রণালিটি অতিক্রম করতে পারবেন।
জাহাজে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিকের জন্য এই যাত্রা শুধুই একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয় নয়, বরং এটি যেন নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার অনুভূতি। ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “মনে হচ্ছে যেন বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেলাম। দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি আমরা।” দীর্ঘদিনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর যুদ্ধের আশঙ্কা কাটিয়ে এই যাত্রা তাদের কাছে এক নতুন স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।
চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. রাশেদুল হাসান জানান, গত দুই মাস তারা এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। প্রতিদিন আকাশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আনাগোনা, কাছাকাছি হামলার ঘটনা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালে কাছাকাছি তেল স্থাপনায় মিসাইল হামলার ঘটনা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই একাধিকবার যাত্রা শুরু করেও নিরাপত্তাজনিত কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হয় জাহাজটি। অবশেষে যুদ্ধবিরতির ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবারও সাহস নিয়ে পথে নামে ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
বর্তমানে জাহাজটিতে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বহন করা হচ্ছে এবং পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দর। তবে এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপই হলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম, যেখানে এখনও হাজার হাজার জাহাজ অপেক্ষমাণ।
সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলা এই জাহাজ এখন শুধু পণ্য পরিবহন করছে না, বহন করছে সাহস, ধৈর্য আর বেঁচে থাকার এক অনন্য গল্প—যেখানে আতঙ্ককে জয় করে মুক্তির স্বাদ নিচ্ছেন বাংলাদেশের নাবিকেরা।