ঢাকা ০৯:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাত বছরে সড়কে ঝরেছে ৭,৯৬৩ শিশুর প্রাণ, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে দেবী সিঁদুরখেলা, উলুধ্বনি আর বিদায়ের সুরে শেষ দুর্গোৎসব সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ চাকরি হারিয়ে তিন বিঘায় পেয়ারা চাষ, সাদ্দামের এখন ১২০ বিঘার ফলবাগান মায়ের কোলে ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো রাজিয়ার স্বপ্ন এবার স্বাবলম্বী হওয়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী রংপুরে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী রয়টার্স-ইপসোস জরিপ জনপ্রিয়তা তলানিতে, ট্রাম্পের প্রতি অসন্তুষ্ট ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধবিষয়ক সেমিনারে অংশ নেবেন ডা. জুবাইদা রহমান নাটোরে ভয়াবহ বাস-ট্রাক সংঘর্ষ, প্রাণ গেল ১৪ জনের, আহত ৩২

মায়ের কোলে ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো রাজিয়ার স্বপ্ন এবার স্বাবলম্বী হওয়া

আমিনুল হক ভূইয়া, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ১১:৩৫:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে

মায়ের কোলে ভর করে সাফল্যের সিঁড়ি, রাজিয়ার স্বপ্ন এবার স্বাবলম্বী হওয়া

ভয়েস একাত্তর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে অনেক প্রতিকূলতা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, অর্থসংকট আর প্রতিদিনের অসহনীয় কষ্টকে সঙ্গী করেও সেই সত্যেরই প্রমাণ দিয়েছেন রাজশাহীর মেয়ে রাজিয়া সুলতানা। অন্যের সাহায্য ছাড়া যাঁর পক্ষে চলাফেরা করা কঠিন, সেই রাজিয়াই অদম্য মনোবল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। এখন তাঁর স্বপ্ন একটি চাকরি পাওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট কিছুটা হলেও কমানো।

কিন্তু রাজিয়ার এই স্বপ্নপূরণের পথ এখনো মসৃণ নয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি প্রতিদিন তাঁকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাড়ির সিঁড়ি, যাতায়াতের দুর্ভোগ এবং চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার নানা বাধা। আর এসব বাধা পেরিয়ে মেয়েকে এগিয়ে নিতে যাঁর নিরলস সংগ্রাম, সেই মা নাজনীন বেগমের শরীরেও এখন আর আগের মতো শক্তি নেই।

রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাজিয়ার জন্ম ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর। বাবা হাফিজুর রহমান একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরিবারের দুই সন্তানের একজন রাজিয়া। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনের অংশ। আট বছর বয়স পর্যন্ত কিছুতে ভর দিয়ে কিংবা অন্যের সাহায্যে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একসময় হারিয়ে যায় সেই সামান্য সক্ষমতাও। এরপর থেকে চলাফেরার জন্য মায়ের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁকে।

রাজিয়াদের বাড়ি তিনতলা। তাঁরা থাকেন দোতলায়। বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে ওঠানামা করতে হয় নাজনীন বেগমকে। প্রতিদিনের এই কাজ যে কতটা কষ্টের, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শরীরও দুর্বল হয়েছে। তবু মেয়ের প্রয়োজনের কাছে নিজের ক্লান্তি যেন বারবার হার মেনেছে।

রাজিয়ার শৈশব থেকেই তাঁর মা ছিলেন সবচেয়ে বড় আশ্রয়। স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, প্রতিটি ধাপেই মেয়েকে সহযোগিতা করতে হয়েছে তাঁকে। একসময় যে মেয়েকে কোলে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতেন, সেই মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করাতেও একইভাবে পাশে থাকতে হয়েছে।

পাঁচ-ছয় বছর বয়সে বাড়ির কাছের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন রাজিয়া। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। অনেকের কাছে হয়তো সেখানেই থেমে যেত শিক্ষাজীবন। কিন্তু রাজিয়ার ক্ষেত্রে তা হয়নি। নানার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আবারও পড়াশোনায় ফেরেন তিনি।

প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে রাজিয়া রাজশাহী বহুমুখী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি এবং রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তাঁর জীবনে ছিল বড় অর্জন। কিন্তু নতুন পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। বিভাগটির শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হতো। মেয়েকে নিয়মিত কোলে করে তিনতলায় ওঠানো-নামানো নাজনীন বেগমের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল। পরে বিভাগ পরিবর্তনের আবেদন করে বাংলা বিভাগে পড়াশোনা চালিয়ে যান রাজিয়া।

তবে বিভাগ পরিবর্তন হলেও তাঁর দুর্ভোগ পুরোপুরি কমেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ির পাশাপাশি বাড়ির সিঁড়িও প্রতিদিনের সংগ্রামের অংশ হয়ে ছিল। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে চলাচল আরও কষ্টকর হয়ে উঠত।

মায়ের কোলে ভর করে সাফল্যের সিঁড়ি, রাজিয়ার স্বপ্ন এবার স্বাবলম্বী হওয়া

চূড়ান্ত পরীক্ষা চলাকালে একদিন বৃষ্টির মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মায়ের কোল থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পান রাজিয়া। দুর্ঘটনার কারণে সেদিন আর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমন একটি ঘটনা অনেকের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু রাজিয়া হাল ছাড়েননি। মায়ের সহযোগিতা আর নিজের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সুযোগ ও সহায়তা পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হলেও রাজিয়ার সংগ্রাম শেষ হয়নি। এখন চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চান তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, একটি চাকরি পেলে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন, নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি মায়ের কষ্টও কিছুটা লাঘব করতে পারবেন।

কিন্তু চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা। কোচিং সেন্টারে গিয়ে নিয়মিত প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। অন্যদিকে, বাড়ির দোতলায় বসবাস করায় বাইরে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়ার জন্যও মায়ের সাহায্য নিতে হয়। প্রতিদিন মেয়েকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করানো এখন নাজনীন বেগমের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি কষ্টকর।

রাজিয়ার বাবা হাফিজুর রহমান কাজের প্রয়োজনে দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। সীমিত আয়ের এই পরিবারে তাই মেয়ের দৈনন্দিন চলাচল ও পরিচর্যার বড় দায়িত্ব সামলাতে হয় মাকেই। রাজিয়ার ছোট ভাইও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। বর্তমানে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

রাজিয়ার পরিবারের বসবাসের সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাড়ির নিচতলার কক্ষ ব্যবহারের বিষয়টিও। রাজিয়ার বাবা সাত ভাইয়ের একজন। তাঁদের একজন মারা গেছেন। তিনতলাবিশিষ্ট বাড়িটির নিচতলার তিনটি কক্ষে থাকেন রাজিয়ার ছোট চাচা আমিনুল ইসলাম। আর দোতলার তিনটি কক্ষে থাকেন রাজিয়ারা।

পরিবারের পক্ষ থেকে নিচতলার কক্ষগুলোর সঙ্গে দোতলার কক্ষ বিনিময়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অন্তত একটি কক্ষ নিচতলায় পাওয়া গেলেও রাজিয়ার চলাচলের কষ্ট অনেকটা কমত। কিন্তু নিচতলায় দোকান থাকায় সেই জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি নন তাঁর চাচা। তাঁর বক্তব্য, নিচতলার জায়গা ছেড়ে দিলে দোকান নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন?

ফলে সিঁড়ি পেরিয়ে মেয়েকে নিয়ে ওঠানামার কষ্ট এখনো মায়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে আছে। অথচ নিচতলায় থাকার ব্যবস্থা হলে রাজিয়ার বাইরে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাজে অংশ নেওয়া এবং চাকরির প্রস্তুতির জন্য যাতায়াত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারত।

রাজিয়ার জীবনের গল্প কেবল একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণীর শিক্ষাগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ, একটি পরিবারের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার গল্প। যে মা বছরের পর বছর মেয়েকে কোলে নিয়ে একের পর এক সিঁড়ি পেরিয়েছেন, সেই মায়ের কষ্ট কিছুটা কমানোই এখন রাজিয়ার অন্যতম বড় আকাঙ্ক্ষা।

রাজিয়া স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও পরিবারের সহযোগিতায়। এখন প্রয়োজন তাঁর স্বাবলম্বী হওয়ার পথটি আরও সহজ করে দেওয়া। চলাচলের উপযোগী পরিবেশ, চাকরির প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ তাঁর মতো তরুণদের জীবন বদলে দিতে পারে।

রাজিয়ার সামনে এখনো অনেক পথ বাকি। সেই পথে তাঁর প্রত্যাশা, নিজের যোগ্যতায় একটি চাকরি পাওয়া এবং মায়ের মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফোটানো। এত দিন মা তাঁকে কোলে নিয়ে জীবনের সিঁড়ি পার করিয়েছেন। রাজিয়া চান, এবার নিজের অর্জন দিয়ে মায়ের কষ্টের ভার কিছুটা হলেও নামিয়ে রাখতে।

প্রশ্ন শুধু রাজিয়া কত দূর এগোতে পারবেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁর মতো অদম্য ইচ্ছাশক্তির অধিকারী একজন তরুণীর সামনে সমাজ কতটা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে। কারণ, প্রতিভা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রয়োজন সুযোগ, সহমর্মিতা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা। এসব নিশ্চিত করা গেলে রাজিয়ার স্বপ্ন শুধু তাঁর একার সাফল্য হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

মায়ের কোলে ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো রাজিয়ার স্বপ্ন এবার স্বাবলম্বী হওয়া

আপডেট সময় : ১১:৩৫:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে অনেক প্রতিকূলতা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, অর্থসংকট আর প্রতিদিনের অসহনীয় কষ্টকে সঙ্গী করেও সেই সত্যেরই প্রমাণ দিয়েছেন রাজশাহীর মেয়ে রাজিয়া সুলতানা। অন্যের সাহায্য ছাড়া যাঁর পক্ষে চলাফেরা করা কঠিন, সেই রাজিয়াই অদম্য মনোবল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। এখন তাঁর স্বপ্ন একটি চাকরি পাওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট কিছুটা হলেও কমানো।

কিন্তু রাজিয়ার এই স্বপ্নপূরণের পথ এখনো মসৃণ নয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি প্রতিদিন তাঁকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাড়ির সিঁড়ি, যাতায়াতের দুর্ভোগ এবং চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার নানা বাধা। আর এসব বাধা পেরিয়ে মেয়েকে এগিয়ে নিতে যাঁর নিরলস সংগ্রাম, সেই মা নাজনীন বেগমের শরীরেও এখন আর আগের মতো শক্তি নেই।

রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাজিয়ার জন্ম ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর। বাবা হাফিজুর রহমান একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পরিবারের দুই সন্তানের একজন রাজিয়া। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনের অংশ। আট বছর বয়স পর্যন্ত কিছুতে ভর দিয়ে কিংবা অন্যের সাহায্যে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একসময় হারিয়ে যায় সেই সামান্য সক্ষমতাও। এরপর থেকে চলাফেরার জন্য মায়ের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁকে।

রাজিয়াদের বাড়ি তিনতলা। তাঁরা থাকেন দোতলায়। বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে ওঠানামা করতে হয় নাজনীন বেগমকে। প্রতিদিনের এই কাজ যে কতটা কষ্টের, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শরীরও দুর্বল হয়েছে। তবু মেয়ের প্রয়োজনের কাছে নিজের ক্লান্তি যেন বারবার হার মেনেছে।

রাজিয়ার শৈশব থেকেই তাঁর মা ছিলেন সবচেয়ে বড় আশ্রয়। স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, প্রতিটি ধাপেই মেয়েকে সহযোগিতা করতে হয়েছে তাঁকে। একসময় যে মেয়েকে কোলে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতেন, সেই মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করাতেও একইভাবে পাশে থাকতে হয়েছে।

পাঁচ-ছয় বছর বয়সে বাড়ির কাছের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন রাজিয়া। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। অনেকের কাছে হয়তো সেখানেই থেমে যেত শিক্ষাজীবন। কিন্তু রাজিয়ার ক্ষেত্রে তা হয়নি। নানার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আবারও পড়াশোনায় ফেরেন তিনি।

প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে রাজিয়া রাজশাহী বহুমুখী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি এবং রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তাঁর জীবনে ছিল বড় অর্জন। কিন্তু নতুন পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। বিভাগটির শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হতো। মেয়েকে নিয়মিত কোলে করে তিনতলায় ওঠানো-নামানো নাজনীন বেগমের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল। পরে বিভাগ পরিবর্তনের আবেদন করে বাংলা বিভাগে পড়াশোনা চালিয়ে যান রাজিয়া।

তবে বিভাগ পরিবর্তন হলেও তাঁর দুর্ভোগ পুরোপুরি কমেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়ির পাশাপাশি বাড়ির সিঁড়িও প্রতিদিনের সংগ্রামের অংশ হয়ে ছিল। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে চলাচল আরও কষ্টকর হয়ে উঠত।

মায়ের কোলে ভর করে সাফল্যের সিঁড়ি, রাজিয়ার স্বপ্ন এবার স্বাবলম্বী হওয়া

চূড়ান্ত পরীক্ষা চলাকালে একদিন বৃষ্টির মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মায়ের কোল থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পান রাজিয়া। দুর্ঘটনার কারণে সেদিন আর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমন একটি ঘটনা অনেকের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু রাজিয়া হাল ছাড়েননি। মায়ের সহযোগিতা আর নিজের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সুযোগ ও সহায়তা পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হলেও রাজিয়ার সংগ্রাম শেষ হয়নি। এখন চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চান তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, একটি চাকরি পেলে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন, নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি মায়ের কষ্টও কিছুটা লাঘব করতে পারবেন।

কিন্তু চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা। কোচিং সেন্টারে গিয়ে নিয়মিত প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। অন্যদিকে, বাড়ির দোতলায় বসবাস করায় বাইরে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়ার জন্যও মায়ের সাহায্য নিতে হয়। প্রতিদিন মেয়েকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করানো এখন নাজনীন বেগমের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি কষ্টকর।

রাজিয়ার বাবা হাফিজুর রহমান কাজের প্রয়োজনে দিনের বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। সীমিত আয়ের এই পরিবারে তাই মেয়ের দৈনন্দিন চলাচল ও পরিচর্যার বড় দায়িত্ব সামলাতে হয় মাকেই। রাজিয়ার ছোট ভাইও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। বর্তমানে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

রাজিয়ার পরিবারের বসবাসের সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাড়ির নিচতলার কক্ষ ব্যবহারের বিষয়টিও। রাজিয়ার বাবা সাত ভাইয়ের একজন। তাঁদের একজন মারা গেছেন। তিনতলাবিশিষ্ট বাড়িটির নিচতলার তিনটি কক্ষে থাকেন রাজিয়ার ছোট চাচা আমিনুল ইসলাম। আর দোতলার তিনটি কক্ষে থাকেন রাজিয়ারা।

পরিবারের পক্ষ থেকে নিচতলার কক্ষগুলোর সঙ্গে দোতলার কক্ষ বিনিময়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অন্তত একটি কক্ষ নিচতলায় পাওয়া গেলেও রাজিয়ার চলাচলের কষ্ট অনেকটা কমত। কিন্তু নিচতলায় দোকান থাকায় সেই জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি নন তাঁর চাচা। তাঁর বক্তব্য, নিচতলার জায়গা ছেড়ে দিলে দোকান নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন?

ফলে সিঁড়ি পেরিয়ে মেয়েকে নিয়ে ওঠানামার কষ্ট এখনো মায়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে আছে। অথচ নিচতলায় থাকার ব্যবস্থা হলে রাজিয়ার বাইরে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাজে অংশ নেওয়া এবং চাকরির প্রস্তুতির জন্য যাতায়াত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারত।

রাজিয়ার জীবনের গল্প কেবল একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণীর শিক্ষাগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ, একটি পরিবারের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার গল্প। যে মা বছরের পর বছর মেয়েকে কোলে নিয়ে একের পর এক সিঁড়ি পেরিয়েছেন, সেই মায়ের কষ্ট কিছুটা কমানোই এখন রাজিয়ার অন্যতম বড় আকাঙ্ক্ষা।

রাজিয়া স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও পরিবারের সহযোগিতায়। এখন প্রয়োজন তাঁর স্বাবলম্বী হওয়ার পথটি আরও সহজ করে দেওয়া। চলাচলের উপযোগী পরিবেশ, চাকরির প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ তাঁর মতো তরুণদের জীবন বদলে দিতে পারে।

রাজিয়ার সামনে এখনো অনেক পথ বাকি। সেই পথে তাঁর প্রত্যাশা, নিজের যোগ্যতায় একটি চাকরি পাওয়া এবং মায়ের মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফোটানো। এত দিন মা তাঁকে কোলে নিয়ে জীবনের সিঁড়ি পার করিয়েছেন। রাজিয়া চান, এবার নিজের অর্জন দিয়ে মায়ের কষ্টের ভার কিছুটা হলেও নামিয়ে রাখতে।

প্রশ্ন শুধু রাজিয়া কত দূর এগোতে পারবেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁর মতো অদম্য ইচ্ছাশক্তির অধিকারী একজন তরুণীর সামনে সমাজ কতটা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে। কারণ, প্রতিভা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রয়োজন সুযোগ, সহমর্মিতা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা। এসব নিশ্চিত করা গেলে রাজিয়ার স্বপ্ন শুধু তাঁর একার সাফল্য হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।