বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:৪১ অপরাহ্ন

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধ

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১
  • ৩৭ Time View

ডা. এস এম কামরুল আখতার

বাড়িতে আসা-যাওয়ার পথে দেয়াল অথবা পিলারে সাঁটা অর্শ, ফিস্টুলা এবং এ ধরনের রোগের চিকিৎসাসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন চোখে পড়েনি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। যদিও রাজধানীতে এজাতীয় বিজ্ঞাপনের দেখা এখন কম মেলে, ছোট ছোট শহর ও গ্রামে এসব বিজ্ঞাপন প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। ছোটবেলায় আমরা জানতাম মলদ্বারের সব রোগ কৃমি থেকে হয়। আমি নিজেও তখন এমনটাই বিশ্বাস করতাম। তবু যখন অনেক মানুষকে পায়ুপথের রোগগুলোকে গোপন রোগ, যৌনরোগ বা পাপের ফল বলে বিবেচনা করতে দেখি, তখন সত্যিই উদ্বিগ্ন হই। অনেকে অস্ত্রোপচার করতে চান না, আবার কেউ কেউ মনে করেন যে ওষুধই যথেষ্ট। জীবনের কোনো সময় পেটের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাইলসে ভোগেননি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। পাইলস, ফিস্টুলা ও অ্যানাল ফিশারের মতো মলদ্বারের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আমাদের দেশে অনেক বেশি। তবে দুঃখের বিষয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই রোগগুলো সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণা ভিত্তিহীন, ভ্রান্ত এবং কখনো কখনো কুসংস্কারে পূর্ণ।

সম্প্রতি ফুসফুসের ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সারের বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করা হলেও কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সম্পর্কে তেমন সচেতনতা নেই। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর মার্চ মাসকে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার-সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। এ উপলক্ষে আলোচনাসভা, অধিবেশন, কর্মশালাসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এই ক্যান্সার নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা বা জরিপ না হওয়ায় এর বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক লাখ ৪৭ হাজার ৯৫০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোলোরেক্টাল ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে নতুন কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা এক লাখ চার হাজার ৬১০ (৫২ হাজার ৩৪০ জন পুরুষ ও ৫২ হাজার ২৭০ জন নারী) এবং নতুন রেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩ হাজার ৩৪০ (২৫ হাজার ৯৬০ জন পুরুষ ও ১৭ হাজার ৩৮০ জন নারী)।

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের গ্লোবোকন ২০২০-এর সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী নতুন কোলোরেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ ৩১ হাজার ৫৯০ জন, যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ৩৫ হাজার ১৭৩ জন এই রোগে মারা গেছে। বিগত দুই দশকে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই ক্যান্সারের প্রকোপ বেড়েছে। এই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও চীনে। এশিয়ায় কোলন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক (৪৯.৯ শতাংশ) এবং বিশ্বব্যাপী এই ক্যান্সারে মৃত্যুর হার ৫৪.২ শতাংশ।

গ্লোবোকন ২০২০-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে কোলন ক্যান্সারে শনাক্ত নতুন রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৭৫৩ জন, যার মধ্যে এক হাজার ৭৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বলতে কোলনের ক্যান্সার বোঝায়। এটি মলদ্বার বা কোলনের যেকোনো জায়গায় হতে পারে। উৎসর ধরনের ওপর নির্ভর করে একে মলদ্বার বা কোলন ক্যান্সার বলা হয়। মূলত উভয় ক্যান্সারের ধরন ও লক্ষণ প্রায় একই রকম। এই রোগটি সাধারণত কোলনে পলিপ গঠনের মাধ্যমে শুরু হয়। কোলন হচ্ছে বৃহদান্ত্র, আমাদের হজম প্রক্রিয়ার অংশ। আর যে অংশের নিচে মল জমা হয় তাকে বলে মলদ্বার। এই অংশের ক্যান্সারকে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বলা হয়। এই ক্যান্সার এখন খুব সাধারণ একটি রোগ।

এই ক্যান্সারের জন্য বর্তমানে অজস্র চিকিৎসা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে, প্রথমে একটি কেমোথেরাপি সেশন নেওয়া সবচেয়ে ভালো। নিওডজওয়ান্ট কেমোরেডিওথেরাপি করার পরে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ফলাফলের জন্য রোগীর অস্ত্রোপচার করা উচিত। এ ক্ষেত্রে দুই ধরনের সার্জারি রয়েছে। কিহোল সার্জারি ও ওপেন সার্জারি। দ্রুত আরোগ্য লাভ এবং কম বেদনাদায়ক হওয়ার কারণে কিহোল সার্জারি (মিনিমালি ইনভ্যাসিভ সার্জারি) বেছে নেওয়া ভালো।

কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে নিয়মিত ফাইবারযুক্ত, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টস, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা, অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলা এই ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। চল্লিশোর্ধ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিং অথবা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।

যেসব চিকিৎসক শরীরের অন্য অংশের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ, তাঁরা খাদ্যনালির নিচের অংশের রোগগুলো, বিশেষ করে কোলনের রোগ সহজে নির্ণয় করতে পারেন না। দেশে অসংখ্য রোগী থাকা সত্ত্বেও নেই কোনো কোলোরেক্টাল ইনস্টিটিউট কিংবা স্থাপিত হয়নি পৃথক কোনো হাসপাতাল। যদিও অনেকে পাইলসকে সাধারণ একটি রোগ বলে মনে করেন, কিন্তু মলদ্বারে রক্তপাত, ব্যথা এবং অস্বাভাবিক স্ফীতি ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। তাই নিরাময়যোগ্য এই ক্যান্সার প্রতিরোধে প্রয়োজন একটু সতর্কতা ও সচেতনতা। কালের কণ্ঠের সৌজন্যে

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও যুগ্ম সম্পাদক, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223