মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন

শারোৎসব সম্পন্ন : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২০
  • ৩৬৭ Time View

ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা কালিমন্দিরে সস্ত্রীক পুজো দিচ্ছেন ভারতের হাইকমিশনার

ভয়েস রিপোর্ট, ঢাকা 

অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতি একই সূত্রে গাঁথা। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়ার ডাক দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উন্নয়নের ফানুস উড়িয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয় সর্বজনীন উৎসব হিসেবে। গোটা দুনিয়া যখন কাঁপছে করোনা নামক মহামারিতে, তখন বাংলাদেশে দুর্গোৎসব পালিত হচ্ছে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। কেমন সেই উৎসবের চিত্রটা?  এক কথায় বাংলাদেশে শারদোৎসব হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল মডেল। সকল ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রীতিময়, সৌহার্দ্যের বন্ধনে বাধা। সমাজে মিলেমিশে বসবাস করাই শুধু নয়, এক সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মতো দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের চালিকাশক্তিরই অংশ।
রবিবার মহানবমী তিথিতে ঐতিহাসিক রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম পরিদর্শনে এসে সস্ত্রীক পুজো দেন ভারতের হাই কমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী। বাংলাদেশ সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও (ওহফরধ-ইধহমষবফবধয জবষধঃরড়হ) রয়েছে এক অনন্য উচ্চতায় এমন মন্তব্য করেন দোরাইস্বামী। প্রসঙ্গত, ভারতের অর্থসাহায্যে নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে রমনা কালীমন্দিরের। এখানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শনে যান দোরাইস্বামী। রবিবার মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বোল, উলুধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ আর সেই সঙ্গে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে নবমীবিহিত পূজার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হল এ দিনের আনুষ্ঠানিকতা। দেবী দুর্গার বিদায়ের সুরে ভক্তদের হৃদয় ভারাক্রান্ত।

ঢাকার ঐতিহাসিক  রমনাকালি মন্দিরে ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী

রমনা কালিমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম

১৯৭১ সাল। পাকিস্তানী শোষকদের বিরুদ্ধে উত্তাল বাংলাদেশের আপামর জনগণ। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এককাতারে প্রাণ দিতে রাজি বাংলার জনগণ। ৭১’র ২৫ মার্চ বর্বর পাকবাহিনী বাঙলার মানুষের ওপর হায়নার রূপ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। নির্বিচারে মানুষ হত্যায়  মেতে ওঠে। সঙ্গে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ ইত্যাদি চলতে থাকে। বর্বর পাক বাহিনীর আক্রোশ থেকে বাদ যায়নি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। যেখানে যা পেয়েছে, সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে একের পর এক মন্দির ধ্বংস করে দেয় তারা। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক রমনাকালি মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে ট্যাংক বহর নিয়ে হামলা চালানো হয় এবং ডিনামাইট দিয়ে মন্দিরটি উড়িয়ে দেওয়া হানাদার বাহিনী। এখানেই শেষ নয়। মন্দিরের পুরোহিত এবং মন্দিরের আশপাশে বসবাসকারী শতাধিক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বক্তব্য রাখছেন হাইকমিশনার দোরাইস্বামী
রমনাকালি মন্দিরে ভক্তের মিলনমেলা
রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের জয়েন্ট সেক্রেটারি চৈতী রানি বিশ্বাস। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াকালীন তুখোর ছাত্র লিগ নেত্রী হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের জয়েন্ট সেক্রেটারি। শিবের ভক্ত। তার উদ্যোগে মন্দির চত্বরে শিবেরপুজা হয়ে থাকে।  চৈতী রানি বিশ্বাস বলেন, “বাংলাদেশের রীতি অনুযায়ী সকল ধর্মের মানুষের সম্মিলনে অনুষ্ঠিত হয় শারদোৎসব। এটি আমাদের সর্বজনীন। যদিও করোনাকালীন উৎসবে কিছুটা ভাটা পড়েছ, তবু উৎসাহ ও আয়োজনে এতটুকু কমতি রাখা হয়নি।” বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই বলে থাকেন, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। শারদোৎসব পালনে প্রধানমন্ত্রী অনুদানও দিয়েছেন, যা হিন্দু কল্যাণ টাস্ট্রের মাধ্যমে মণ্ডপের মধ্যে বণ্টন হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে চৈতি ধরা গলায় বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বাঙালির ত্রাণকর্তা হিসেবে উন্নয়নের কাজে হাত লাগিয়েছিলেন।  কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় ঘাতকের নির্মম বুলেটে সপরিবার প্রাণ হারান বাংলার এই অবিসংবাদিত নেতা। চৈতি বলেন, “আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিখেছি, কী ভাবে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে হয়। তিনি আমাদেরও উদারতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন। ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মিলনমেলায় পরিণত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। এটাই বাংলাদেশের হাজার বছরের কৃষ্টি-কালচার। প্রত্যেক নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা, সম্পদের সুরক্ষা তথা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
ভারতের হাইকমিশনার দোরাইস্বামী বিদায়  জানান মন্দির কমিটির সভাপতি উৎপল সাহা
কৈলাসে ফিরছেন মা মণ্ডপে মন্ডপে বিদায়ের ঘণ্টা
অশুভ শক্তি নাশ করতে কৈলাশ  থেকে দোলায় চড়ে মর্ত্যলোকে এসেছিলেন দুর্গতনানিশী দেবী দুর্গা। মা তার ভক্তদের দুঃখ দূর করে শান্তি বিলিয়ে দিয়ে গজে চড়ে চলে যাবেন বিজয়াদশমিতে। তাই মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে রবিবার মহানবমীতিথিতেই।  সোমবার সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমীর বিহিত পূজা। এরপর স্বামীর মঙ্গল কামনায় নারীরা মায়ের পায়ে সিঁদুর ছোঁয়াবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবারে সিঁদুর খেলা হচ্ছে না। নিজ নিজ ঘাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিমা বিসর্জনের বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় পুজা উদযাপন পরিষদের তরফে।
চৈতি রানী বিশ^াস জানালেন, বিজয়া দশমীতে মা দুর্গা সব অশুভ শক্তি বিনাশ করে শুভ শক্তির সঞ্চার করেন। মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে জগতবাসী যেন এই পৃথিবীতে সুন্দর-সুস্থভাবে বসবাস করতে পারি, তার জন্য মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি।  সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে মাতৃপূজা সম্পন্ন হবে। করোনা মাহামারির কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পুজা উদযাপন করেছেন জানিয়ে চৈতি বলেন, সরকারের তরফে যে  নির্দেশনা রয়েছে, তা মেনেই এবার শোভাযাত্রা হচ্ছে না।  প্রতিমা বিসর্জনে মাত্র ১০ জন যেতে পারবে। চৈতি রানী বিশ^াস আরও জানান,  চণ্ডীপাঠ, বোধন এবং দেবীর অধিবাসের মধ্য দিয়ে  গেল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। রবিবার সকালে বিহিত পূজার মাধ্যমে মহানবমী পূজা এবং সোমবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে পাঁচ দিনের দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা। করোনা মহামারির কারণে  সংক্রমণ এড়াতে এ বছর বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
রমনা কালিমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের পরিচালনা কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারী চৈতি রানী বিশ্বাস
রমনাকালি মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আমরা পুজা সম্পন্ন করতে পেরেছি। তবে, এখানে বিশাল জায়গা রয়েছে। আর পাশেই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সেখানেও মায়ের ভক্তরা ঘুরেফিরে সময় কাটিয়েছেন আনন্দে। সুতরাং রমনা কালিমন্দিরের পুজার আয়োজনের আমেজটাই আলাদা বলে জানান চৈতি। তিনি বলেন, আমরা ধর্মীয় আলোচনা ও ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান রেখেছি। মন্ডপের সামনের বিশাল চত্বরে হাজার দু’য়েক চেয়ার রয়েছে। মন্দিরের পুকুরের মধ্যিখানে ৪০ ফুট উচ্চতার নারায়ণের মূর্তি। সব মিলিয়ে রমনাকালিমন্দিরের আয়োজনটাই বিশাল। তবে, করোনা মহামারির কারণে আমরা উৎসবের অনেক কিছুই বাদ দিয়েছি। এবারে অনেকটা  সাত্ত্বিক পূজায় সীমাবদ্ধ রাখেই সকলের সহযোগিতায় শারদীয় দুর্গোৎসব পালন সম্পন্ন করেছে শ্রী শ্রী রমনা কালিমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম।  এবারে বাংলাদেশে প্রায় ৩১ হাজার মন্ডপে পুজা উদযাপন হয়েছে। এরমধ্যে মহানগরীতে ২৫৬টি। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক পুজা উদযাপন হয়েছে চট্টগ্রামে ৪২৩১টি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223