আমিনুল হক, ঢাকা
ঋতুরাজ বসন্তের আগমণে প্রকৃতি অপরূপ রঙে সেজে ওঠে। নব ফাল্গুনের বর্ণিল এ আবাহনে মনের নন্দনমঞ্চে নেচে ওঠে অসংখ্যক উদাসী মনপাখি। ফাল্গুলের রঙিন বাতাসে ধুয়ে যাক বিষাদের ছায়া। এমন প্রত্যাশা নিয়েই বিষাদের বছর শেষে পালিত হলো বসন্ত উৎসব। ঋতুরাজ বসন্ত। সঙ্গে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ইংরেজি ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আর বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী পহেলা ফাল্গুন ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি। নতুন সংশোধিত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী একই দিনে পালিত হচ্ছে বসন্ত উৎসব আর ভালোবাসা দিবস। করোনার কারণে নগরের চারপাশে হয়তো ততটা দেখা মেলেনি বসন্তের রঙিন হাওয়ায় ভেসে যাওয়া মানুষদের। কানে আসে দলবেধে শিশু-কিশোরদের বাজির শব্দ। তবে অনেকে জায়গায় পোশাক-পরিচ্ছদে দেখা মিলেছে ফাগুন আর ভালোবাসার রঙের ছোঁয়া। কর্মদিবসের কারণে নগরে ভালোবাসার জোয়ারে ততটা ভাসতে দেখা যায়নি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায়। ঘরবন্দী মানুষ বেচে নিতে বাধ্য হয় অসহায় জীবযাপন। যুগে যুগে নানা রকমের ভাইরাসের প্রার্দুভাব যে ঘটেনি তা নয়। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী এমন ভয়ানক ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হবার ইতিহাস নেই। যা কিনা মানুষকে নিঃসঙ্গই শুধু নয়, দূরে ঠেলে দিয়েছে। মৃত স্বজনকেও যেখানে সৎকারের দায়িত্বটুকু পালন করা সম্ভব হয়নি, সেখানে ভালোবাসা দিবস বা বসন্ত উৎসবের রঙিন ছোঁয়ায় মানুষ মেতে ওঠবে কি করে?
স্বজনকে দূরে ঠেলে দেয়ার মতো ভাইরাসের সঙ্গে পৃথিবী পরিচিত হলো। এটি স্থান পাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বড় ঘটনা হয়ে থাকবে। ফলে সব কিছু বিবেচনা করে বিষাদের বছর পেরিয়ে গেলেও এবারের বাসন্ত উৎসব ঢামাডোল পিটিয়ে করা সম্ভব হয়নি। সর্বত্র অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি মেলেনি সরকারের তরফে। অথচ এদিনটি রাজধানী ঢাকা পরিণত হতো বসন্তের শহরে। এবারে তা উদাও। একমাত্র সোহরারাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজন করা হয় বসন্ত উৎসবের। তাতেও সব বয়সী মানুষের সম্মিলনে বাংলাদেশে যে উৎসব পালন হয়ে আসছে, এবারে ছিল তার ব্যতিক্রম। আয়োজকরা জানালেন, তাদের ইচ্ছের বিপরীতে অনুষ্ঠানে বয়স্ক ব্যক্তিদের যোগ দিতে বারণ ছিলো। এটা করতে গিয়ে তাদের হৃদয়ে রক্ত ঝরেছে। তারপরও শান্তনা-মহামারিকে যথা সম্ভব এড়িয়েই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন তারা।
মরণ ভাইরাস প্রাণের উৎসবের মহামিলনের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। গত বছর বসন্ত উৎসব এবং বিশ^ ভালোবাসা দিবসে প্রায় ৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছিল ঢাকার ফুলমার্কেটে। এবারে সেখানে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রির কথা লক্ষ্যমাত্রার কথা জানালেন ব্যবসায়ীরা। মিরপুর থেকে স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে শাহবাগে ফুল কিনতে এসেছেন স্বপন। সবাই হলুদ পোষাকে নিজেদের সাজিয়েছেন। জানালেন, ভাইরাসের প্রার্দুভাবের কারণে এক বছর পর সপরিবারে বেড়িয়েছেন। সংখ্যা কম হলেও বসন্ত উৎসব যে বাঙালির প্রাণের উৎসব সে বিষয়ে কোন কমতি ছিল নানা আয়োজনে।
উৎসব কমিটির তরফে মানজার চৌধুরী সুইট জানালেন, বরাবরের মতো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুল তলায় বসন্ত উৎসবের মঞ্চ সাজবে এটাই সবার জানা। কিন্তু মরণ ভাইরাসের কারণে এবারে কোথাও অনুমতি মেলেনি। ধরা গলায় সুইট বললেন, কি আর করা। শেষ আশ্রয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিল্পকলা একাডেমীর উন্মুক্ত মঞ্চ। এখানেই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের অনুমতি মিলেছে। বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে পুরাতন ঢাকার গেন্ডারিয়ায় সীমান্ত খেলাঘর প্রাঙ্গণে হয় দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ সমাপনি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবারের বসন্ত উৎসব পালনের দায়বদ্ধ শেষ হয়।