বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:২২ অপরাহ্ন

জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী

ভয়েস রিপোর্ট, ঢাকা
  • Update Time : শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১
  • ৪১ Time View

কাজী নজরুল ইসলাম (১১ জ্যষ্ঠৈ ১৩০৬—১২ ভাদ্র ১৩৮৩)

ছবি: সংগৃহীত

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়।
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি…
-মূর্খরা সব শোন,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!’
(মানুষ)

আমাদের পরিচয় হলো আমরা মানুষ। এই মানুষের চেয়ে বড় কিছু যে হতে পারে না, ধর্মও সে কথাই বলে। কিন্তু আমাদের সমাজের কিছু মানুষ রয়েছে, যারা নিজেদের সার্থের জন্য ধর্মের অপব্যবহার করে। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে অসহায় মানুষদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। আর এভাবেই ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজেদের সার্থ উশুল করা মানুষদের নিচু মনের কথা প্রকাশ পেয়েছে এ কবিতায়।

আজ ১২ ভাদ্র, প্রেম, দ্রোহ, সাম্যবাদ ও জাগরণের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এদিনে পরলোকে গমন করেন চিরতারুণ্যের প্রতীক কবি নজরুল। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত কবি।

নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যটি প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে। এর আগে ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’-এর মুখপত্র লাঙল পত্রিকার বিশেষ (প্রথম) সংখ্যায় ‘সর্বপ্রধান সম্পদ-রূপে’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সাম্যবাদী গ্রন্থের কবিতাবলিতে ধর্ম-জাতি-সম্প্রদায়গত ভেদাভেদকে অতিক্রম করে মানবতাবাদী চেতনায় সাম্যবাদী-প্রবণতাকে জায়গা করে দিয়েছেন নজরুল। কবির মতে

সকল ধর্মের মূল বাণী হলো-মানুষ ও মানবতা। তাঁর ধারণা বিভেদ আর শ্রেণিবিভাজন করেছে মানুষ; নিজেদের লাভের জন্য। তাই সমাজের কোলাহল থেকে সরে দাঁড়িয়ে হৃদয়ের আকুলতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন তিনি দারুণ আগ্রহ ও সাহসের সাথে। মানুষের জয়গান গেয়েছেন কবি দেশ-কাল-পাত্রের ভেদাভেদকে ছাড়িয়ে।

সাম্যবাদী জীবনের চেতনায় উপনিবেশ বিরোধিতা এবং জাতীয়তাবাদ নজরুলের মধ্যে মহত্তর বোধে চালিত হতে পেরেছে। নজরুল তাঁর কাব্যজীবনের প্রারম্ভ থেকেই হিন্দু-মুসমানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অভিন্ন বলয়ে স্থাপন করতে পেরেছিলেন।

অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলন যখন কতকটা স্তিমিত, তখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাতাস তীব্র হয়ে উঠল। নজরুল তখন বাঙালি জাতির সামনে নিয়ে এলেন মানবতাবাদের শাশ্বত বারতা।

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/কাণ্ডারী! ডুবছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র। ’ তার ভাবনায় সমুন্নত ছিল মানব জাতির ঐতিহ্য।

সাম্প্রদায়িক বিবাদ প্রসঙ্গে তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ। দাঙ্গায় যে উভয় সম্প্রদায়েরই দায় রয়েছে, তা তিনি পক্ষপাতহীন দৃষ্টিতে অবলোকন ও উপলদ্ধি করেছেন। কুসংস্কার আর সঙ্কীর্ণ মানসিকতায়

আচ্ছন্ন উগ্রপন্থী সাম্প্রদায়িকরা তাকে তার সৃষ্টির পথে বার বার বাধা দিয়েছে। দৃঢ়চেতা কবি নজরুল তখনও থেকেছেন আপোসহীন, প্রবল প্রতিবাদী।

প্রসঙ্গত, ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেয়া তাঁর ভাষণের কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি-‘কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটো কিছুই নয়। আমি মাত্র, হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি।

আমাদের পরিচয় হলো আমরা মানুষ। এই মানুষের চেয়ে বড় কিছু যে হতে পারে না, ধর্মও সে কথাই বলে। কিন্তু আমাদের সমাজের কিছু মানুষ রয়েছে, যারা নিজেদের সার্থের জন্য ধর্মের অপব্যবহার করে। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে অসহায় মানুষদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

আর এভাবেই ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজেদের সার্থ উশুল করা মানুষদের নিচু মনের কথা প্রকাশ পেয়েছে এ কবিতায়।

তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আর ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তরঙ্গকে নজরুল তার সাহিত্যে বিপুলভাবে ধারণ করেছেন। সেই

সময়ে ধর্মান্ধ মুসলমানদের তিনি পুনর্জাগরণের ডাক দিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল একজন বলিষ্ঠ নেতার মতো। কাজী নজরুল ইসলাম প্রেমের কবি, বিরহ-বেদনা ও সাম্যের কবি। বাংলা সাহিত্য-সংগীত তথা সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ। তবে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার লেখনী ধূমকেতুর মতো আঘাত হেনে জাগিয়ে দিয়েছিল ভারতবাসীকে। তিনি পরিণত হন বিদ্রোহের

কবিতে। আজও তার নানা ধরনের লেখার মধ্য থেকে বিদ্রোহের পঙিক্তমালা বাঙালির হৃদয়ে অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দুন্দুভি বাজিয়ে চলে। তার কবিতা ‘চ্ল চল্ চল্’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত।

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি

বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগরাগিণী সৃষ্টি করে বাংলা সংগীতজগেক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

প্রেম, দ্রোহ, সাম্যবাদ ও জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস। নজরুলের কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। তিনি

ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক। তার লেখনী জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তার কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে উপমহাদেশের অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ব্যর্থ অনুকরণ ও অনুসরণের কৃত্রিমতা থেকে আধুনিক বাংলা কবিতাকে মুক্ত করার

ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে ফলপ্রসূ। তাই তিনিই রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ। নজরুল তার কবিতা, গান, উপন্যাসসহ অন্যান্য লেখনী ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পরাধীন ভারতে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। সে

কারণে ইংরেজ সরকার তার গ্রন্থ ও রচনা বাজেয়াপ্ত করেছে এবং কারাদণ্ড দিয়েছে। কারাগারেও বিদ্রোহী নজরুল টানা চল্লিশ দিন অনশন করে বিদেশি সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ করেছিলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান

জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন।

১৯৭২ সালের ২৪ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবি সপরিবারে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশ সরকার কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন এবং জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি

বাংলাদেশেই ছিলেন। তার জীবনকাল ৭৮ বছর হলেও ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি অসহনীয় নির্বাক জীবন কাটিয়েছেন।

জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ

অনুষ্ঠানমালা প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসটি উপলক্ষে কবির মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।

এদিকে, কবি নজরুল ইনস্টিটিটিউিট সকাল ১০টায় ভাচুর্য়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। বাংলা একাডেমি বিকাল ৪টায় ভার্চুয়াল

অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এছাড়া ছায়ানট জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ রাত ৯টায় তাদের ফেসবুক পেইজে সরাসরি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223