বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:০৪ অপরাহ্ন

‘কোভিড দ্বিতীয় ওয়েব’ এবং আগুনযোদ্ধার গল্প

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, (মালদা) পশ্চিমবঙ্গ
  • Update Time : বুধবার, ১২ মে, ২০২১
  • ১০৯ Time View

ছবি সংগ্রহ

বলাবাহুল্য, এটা একটা আপামর বাঙালির ট্রেন্ড যে, ভারত-বাংলাদেশ আসলে একই গর্ভজাত সন্তান। এটা মনে মনে লালন করতে আমরা বাঙালিরা ভালোবাসি। যেন, একই সঙ্গে আছি, এটা অবশ্যই গর্বে বুক ফুলে ওঠা ব্যাপার। অর্থাৎ, আরও খোলাসা করে বললে, এবার-ওপার ‘বাঙলা’ শব্দটিই পাঁজরের মধ্যে একটা শক্তি যোগায়। এটাকে ভাষাবন্ধনীও আমারা বলতে পারি। মাতৃভাষা বাংলা।

পৃথিবীর কোনো এয়ারপোর্টে, কোনো রেলস্টেশনে কিম্বা কোনো বাস টার্মিনালে নেমে গট্ গট্ করে পরিষ্কার বাংলা ভাষায় কথা বলতে বলতে চলে যাওয়া যায়না। থমকে দাঁড়াতি হয়। অন্তত ‘বাংলাদেশ গিয়েতো সম্ভবই নয়’। একথা গুলো বলা অপশনাল কি-না সেটা এই নিবন্ধ ছাপতে যে ভয়েজ একাত্তর আর্জি জানিয়েছে, তাদের ওই ‘৭১ শব্দের মধ্যেই নিহিত আছে।

তখন আমি আমার শৈশবেই বিচরণ করছি। ফিসফিস শুনতে পাচ্ছি বাবা জ্যাঠাদের মুখে ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে’। এরপর আকাশে অনবরত বোমারু বিমান হামলা চালাচ্ছে। বাড়িগুলোর সদর দরজার সামনের খোলা ময়দানে বাঙ্কার কাটা হোলো। স্ট্রিট লাইটগুলোকে কালো আলকাতরার টোপর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হোলো। এইসব দৃশ্যাবলী কার্যত শিশুমনে যুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা মুক্তোর মতো ছোটো ছোটো ঘূর্ণি তৈরি করেছিলো।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরাট আকারের ট্যাঙ্কাগুলো আমাদের খেলার মাঠে জমায়েত হতেই ছোট্ট মনের ভেতর বিভূতিভূষণের ছোট্ট অপুর আবিস্কারের একের পর এক পাঁচালি, যা কিনা জীবন এক যুদ্ধের পটভূমি, একথা গেঁথে দিয়েছিলো। এখনও স্পষ্ট মনে আছে, ভারতীয় ফৌজদের গাড়িগুলোকে ঘিরে ছোটো ছোটো চা-এর দোকান, খাবারের দোকান এমনকি সাময়িক স্নানঘর ও টয়লেট তৈরির কাজ করতে আসা একদল শ্রমিক, এরাও যে যোদ্ধা, এটা অনেক পরে বুঝেছি।

এমনই যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব ১৯৮৫ সালের একত্রিশে অক্টোবরেও দেখেছি, যখন প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁরই সফরদরজং রোডের বাসভবনের আঙ্গিনায় তাঁরই বিশ্বাসী দেহরক্ষীরা গুলিতে ঝাররা করে দেয়। এক্ষেত্রে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধীর নামের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর বাঙালির ঘর অকস্মাৎ অন্ধকার নেমে আসে। সেই প্রদীপ রক্ষার কারিগরেরাও যে এক-একজন বড় যোদ্ধা, একথাও এখানে স্মর্তব্য ।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কাল! এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক প্রশ্বাস থেকে অন্য নিঃশ্বাসে এর অবাধ চলাচল। এ কোনো সীমান্তের প্রটোকল মানেনা। মানেনা আন্তঃরাজ্যের চলাচলের রাস্তার ল্যান্ডমার্ক। মহারাষ্ট্রের পুনেতে ফেব্রুয়ারিতে যখন কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ওয়েব সিরিজ তার চূড়ান্ত ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে, তখন ক্যালাস এক নির্বাচন কমিশন পশ্চিম বাংলাসহ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী প্রহসন চালালো।

ফলাপল যা হওয়ার তাই হলো। এই মৃত্যুর মিছিল, যা জীবনকে বড় এক প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু হেরে গেলে তো চলবে না! গঙ্গা দিয়ে পদ্মায় পৌঁছে যাবে যে অর্দ্ধ দগ্ধ মৃতদেহগুলো, ওরা একদিন জীবনের জন্য যুদ্ধ করতে করতে অসময়ে মৃত্যুর কাছে হাত জোর করে বলেছিলো, আমরা বাঁচতে চাই….

এইসব মৃত মানুষেরা যোদ্ধা। আবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে শ্রমিকেরা সাময়িক ল্যাট্রিন, বাথরুম তৈরি করেছিলো ফৌজদের জন্য, তারাও যোদ্ধা। যে কারিগর এই মুহুর্তেও একাত্তর বা শ্রীমতী গান্ধীর অসময়ের মৃত্যুকালে মোমবাতি তৈরি করেছে বা করেই চলেছে, তারাও যোদ্ধা, ঠিক যেমন যোদ্ধা রেড ভলান্টিয়ার বাহিনী, যারা এই দ্বিতীয় ওয়েবে গভীর রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে অসহায় মানুষের ঘরে প্রাণ বায়ু স্বরূপ জিয়নকাঠি গ্যাসের সিলিন্ডার পৌঁছে দিচ্ছেন।

যোদ্ধাদের কত রকমের শ্রেণী বিভাজন। এই যেমন, ক্রিয়েটিভ কর্নার গ্রুপের সেই কথাকলি বলে মেয়েটি নিজের হাতে ১৫ কেজি ঘরে বানানো ঘি-এর ছবি পোস্ট করে বললেন, বাজার থেকেও অনেক কম মুল্যে, কেবলমাত্র ‘র’ মেটেরিয়াল-এর দাম টুকু রেখে সে কোভিড আক্রান্ত পেসেন্টের ঘরে ‘রেড ভলান্টিয়ার্সদে’র মাধ্যমে, পৌঁছে দিতে চায়। তখন আমি মনে করি কথাকলি একজন যোদ্ধা। নিরামিষ খাবার–কোভিড আক্রান্ত পেসেন্টের স্বাস্থ্যসম্মত। পোস্তরসহ মাত্র পঞ্চান্ন টাকায়’–যে ফোন নম্বরটি ঘোষণা দেয়, রেড ভলান্টিয়ার্স গ্রুপে, সেও একজন যোদ্ধা।

এতক্ষণের লেখার শেষ অংশে একদল নদীর তীরবর্তী বাসীর কান্না-হাসির গোপন আস্তানায় চলে এসেছে শত শত জলেভাসা মৃতদেহ। অধিবাসীরা খড়কুটোর আগুন জ্বালাচ্ছে। এ আগুনে সততা আছে। এরা আগুন তৈরি করে বুকের ভেতরে। আগুনের নির্মিতিতে বারুদের নিজস্বতা থাকে। তাকে বিবেক বলা হয়। তাই আগুনের কারিগরেরাও জীবনেরই আরেক যুদ্ধাংশ।

আর যারা যুদ্ধাপরাধী, যারা এমন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হবে জেনেও নির্বাচনের জন্য চোখের পলক না ফেলা আফিমের ঘনঘোরে নিজেদের আবৃত করে রাখে, তারা কেউ যোদ্ধা নন। বরং ইতিহাসের পাতায় অশান্ত সময়ের অঙ্গীকারভঙ্গকারীরা নির্বোধ। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বিচারের বাণী, নীরবে নিভৃতে কাঁদে…

লেখক : সাংবাদিক, কবি ও গল্পকার।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2017 voiceekattor
কারিগরি সহযোগিতায়: সোহাগ রানা
11223